মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ও একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ‘শান্তি কমিটি’ ও রাজাকার বাহিনীর সদস্য বর্তমান জামাত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওরফে দেলুর মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
গতবছর ২৮ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) সকাল ১১টার দিকে ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর সূচনা বক্তব্য শেষ করার পর রায় পড়া শুরু করেন বিচারপতি আনোয়ারুল হক। সাঈদীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ২০টি অভিযোগর মধ্যে বিচারপতি আনোয়ারুল হক ১, ২, ৩, ৪, ১৩ পড়েন।
অগ্নি সংযোগ, লুট, ধর্মান্তরে বাধ্য করা ও গণহত্যায় যুক্ত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
বর্তমানে রায়ের পরবর্তী অংশ পড়েন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন। ৬, ৭, ৮, ১০, ১১, ১৪, ও ১৬ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। যার মধ্যে রয়েছে হত্যা লূট অগ্নিসংযোগ, অপহরণ, নির্যাতন ও ধর্ষণের অপরাধ। এছাড়া সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা ৫,৯, ১২, ১৫, ১৭ নম্বর প্রমাণিত হয়নি।
সূচনা বক্তব্যে বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পরিচয় দেশব্যাপী সবাই জানেন। কিন্তু আজ তার বর্তমানে যে পরিচয়, সে পরিচয়ে আমরা কোনো বিচার করছি না। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল ৩০ বছর। সাক্ষীদের সাক্ষ্য থেকে জানা গেছে, তিনি রাজাকারদের কোনো কমান্ডার ছিলেন না। তিনি ‘শান্তি কমিটির’ একজন সাধারণ সদস্য ছিলেন।
উর্দু ভাষা জানার কারণে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সর্ম্পক ছিল। তাই তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে প্রতিটি অভিযানে অংশ নিতেন। তার গ্রামের ছিল পিরোজপুরের সাউথখালিতে। তার বিরদ্ধে যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা ওই গ্রামের নিরীহ সাধারণ মানুষ। তাদের সাক্ষ্য থেকে আজ এ বিচারকাজ চলছে।
সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে ২৮ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসামিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন ১৭ জন। সাক্ষীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে আমরা রায় ঘোষণা করছি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রায়ের প্রথম অংশ পড়ছেন বিচারক আনোয়ারুল হক।
এর আগে সকালে সাঈদীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। পরে রায় ঘোষণা শুরু আগে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল ১-এ সাঈদীর এ মামলাটি এক নম্বর মামলা। এই ট্রাইব্যুনালের এটি প্রথম রায়। তবে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে বহু প্রতীক্ষিত এই বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পর এটি হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের মামলার তৃতীয় রায়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাঈদীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা উপলক্ষে আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ভবন ও এর আশেপাশের এলাকায় কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী। সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা।
পুলিশের পাশাপাশি র্যা ব ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা বাহিনীও দায়িত্ব পালন করছে।
ফিরে দেখা কিছু কথা :
প্রসঙ্গত, এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি মামলার যুক্তিতর্ক শেষ করে যেকোনো দিন রায় দেয়া হবে মর্মে (সিএভি) রেখে দেয়া হয়। গতকাল (বুধবার) ট্রাইব্যুনাল ১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ দিন নির্ধারণ করে।
তারও আগে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর এই মামলা কার্যক্রম শেষে রায়ের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু ১১ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যানের পদ থেকে বিচারপতি নিজামুল হক সরে দাঁড়ান। পরে বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরকে চেয়ারম্যান করে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়।
এরপর আসামিপক্ষ মামলাটি পুনর্বিচারের আবেদন করে। গত ৩ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল পুনর্বিচারের আবেদন খারিজ করে নতুন করে যুক্তি উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন সাঈদীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এ মামলায় ২০১১ সালের ১১ জুলাই সাঈদীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওই বছরের ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন এবং ৭ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর মধ্য দিয়ে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়া হয়। আর গত বছরের ২৩ অক্টোবর দুই পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর ৫ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুইপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ ও এ ধরনের অপরাধে সাহায্য ও জড়িত থাকার ঘটনায় ২০টি অভিযোগ আনা হয় সাঈদীর বিরুদ্ধে। কিন্তু আদালত ১৯টি অভিযোগ আমলে নিয়ে আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।