রাজধানীর গোপীবাগে ৬ খুনের ঘটনায় দীর্ঘ নয় মাস পর অন্য তিন মামলার চার আসামিকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ৪ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আবুল খায়ের মাতুব্বর বুধবার ওই চার জনকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে।
গোপীবাগে ৬ ছয় হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দেখান এবং ১০ দিন করে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন জানান তিনি।
আজ শুনানি শেষে মহানগর হাকিম ইউনূস খান চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তারা হলেন: জিয়াউল ইসলাম, আল আমিন, আজমির ও গোলাম সারওয়ার।
আদালত পুলিশের উপ পরিদর্শক রাকিব উদ্দিন জানান, এ চার জন রমনা থানার তিনটি মামলার আসামি। এরমধ্যে একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের এবং বাকি দুটি বিস্ফোরক আইনের মামলা।
চার আসামির মধ্যে একজনের পক্ষে আইনজীবী মো. মান্নান রিমান্ডের আবেদনের বিরোধিতা করলেও বিচারক তা আমলে নেননি।
গত বছর ২২ ডিসেম্বর রাজধানীর গোপীবাগের একটি বাসায় ছয় জনকে গলাকেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন সম্পর্কে বাবা ও ছেলে। তারা হলেন লুত্ফর রহমান (৬০) ও মনির হোসেন (৩০)।
হত্যাকাণ্ডের পরে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছিল কিছুদিন আগে তারা বাসাটিতে উঠেছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিহত ছয় জনের মধ্যে লুত্ফর রহমান নিজেকে পীর বলে পরিচয় দিতেন।
বাকি চার জন হলেন: মঞ্জু, শাহিন, রাসেল ও মুজিবুর রহমান। তাদের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
উল্লেখ: গোপীবাগের ৬৪/৬ আর কে মিশন রোডের চারতলা ভবনের দোতলায় সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ওই খুনের ঘটনা ঘটে। বাসার ভেতরে চিত্কার শুনে আশপাশের লোকজন পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ছয় জনের মরদেহ উদ্ধার করে। বাসার একটি কক্ষে ছিল চার জনের মরদেহ ও আরেকটি কক্ষে ছিল দুজনের মরদেহ ছিল। প্রত্যেকের মুখে স্কচটেপ ও তাঁদের হাত-পা বাঁধা ছিল। এ ছাড়া বাসার আরেকটি কক্ষ থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চার জনকে জীবিত উদ্ধার করে পুলিশ।
ওই সময় পুলিশের ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের বলেন, নিহত লুত্ফর রহমান তিন মাস আগে ওই বাসা ভাড়া নেন। তখন থেকে তিনি ওই বাসায় থাকেন। তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা করতেন। এ জন্য তাঁর ভক্ত বা মুরিদরা ওই বাসায় যেতেন। ওই বাসা থেকে যাঁদের জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁরা পুলিশকে বলেছেন, সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আট থেকে ১০ ব্যক্তি ওই বাসায় ঢুকে তাঁদের হাত-পা বেঁধে ফেলে। তারপর ওই ছয়জনকে হত্যা করা হয়।
মেহেদী জানান, লুত্ফর রহমানের স্ত্রীসহ অন্য সদস্যদের বাসার আরেকটি কক্ষে আটকে রেখে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। পীরের অনুসারী সেজে ভেতরে ঢুকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ওই বাসা থেকে চিত্কারের শব্দ আসলে মানুষজন এগিয়ে যায়।
পাশের ভবনের বাসিন্দা মসিহ হোসেন বলেন,‘চিত্কার শুনে দৌঁড়ে গিয়ে দেখি দরজার সামনে দুটি লাশ পড়ে আছে। একটি বয়স্ক লোকের এবং অপরজনের বয়স অনেকটা কম।’
নিহত লুত্ফর রহমানের স্ত্রীর বরাত দিয়ে পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার দিকে আট যুবক দৌঁড়ে ওই ভবনে প্রবেশ করে। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে সেখানে এসেছে বলে যুবকেরা গৃহকর্তাকে জানান। নিজেদের রাজনৈতিক কর্মী পরিচয় দিয়ে যুবকেরা ফারুকের কাছে আশ্রয় চান। কিছুক্ষণ পর বাসার ড্রয়িং রুমে তাঁরা একসঙ্গে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। পরে সবাই মিলে ঘরে থাকা মুড়ি খান। এরপরই আকস্মিকভাবে আট যুবক ধারালো অস্ত্র বের করে সবাইকে জিম্মি করে ফেলেন। আড়াই বছরের শিশুসহ পাঁচ নারীকে একটি কক্ষে আটকে রাখেন তারা। বাসায় উপস্থিতদের মধ্যে ফারুক ও তাঁর ছেলে মনিরকে আলাদা ঘরে নিয়ে যান ওই যুবকেরা। অন্য চার পুরুষকেও আলাদা কক্ষে আটকে ফেলেন তারা। এরপর বাড়িটিতে লুটপাট চালিয়ে ও অন্যদের জবাই করে চলে যান তারা।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেন। ও্ইদিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নীচতলার মেসের পাঁচজন এবং বাড়ির তিনতলা থেকে একজনসহ মোট ছয়জনকে আটক করেছে পুলিশ।