বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘কটূক্তি’ অভিযোগে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বলে উকিল নোটিস পাঠিয়েছে এক আইনজীবী।
রোববার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ও আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের নেতা মোমতাজ উদ্দিন মেহেদীর এ নোটিস রেজিস্ট্রি ডাকে তারেক রহমানের গুলশানের ঠিকানায় পাঠিয়েছে।
এ নোটিসে বলা হয়, আপনি স্বাধীনতার মহান স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, ইতিহাসের মহানায়ক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রদ্রোহী ও পাকবন্ধু বলে এবং পাকিস্তানের নাগরিক আখ্যা দিয়ে অমার্জনীয় অপরাধ করেছেন। এই অপরাধ রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। ওই বক্তব্যের জন্য সাত দিনের মধ্যে ক্ষমা না চাইলে তারেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করার কথাও জানিয়েছেন মোমতাজ।
গত বুধবার লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে তারেক বলেন, বঙ্গবন্ধু ‘পাকিস্তানি পাসপোর্টে’ দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং এ কারণে তার বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহিতার মামলা’ হওয়া উচিৎ।
ওই বক্তব্য দিয়ে আপনি নিজেকে একজন অপরিপক্ক ও ইঁচড়েপাকা ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারমান হওয়া সত্ত্বেও আপনার মধ্যে কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন দুর্নীতির মামলা হয়।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে পরের বছরের সেপ্টেম্বর মাসে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য যান তিনি। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তখন থেকে সেখানেই রয়েছেন তারেক।
বক্তব্যে তারেক যা বলেছিলেন:
আবারো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় পূর্ব লন্ডনের আট্রিয়াম হলে বিএনপির যুক্তরাজ্য শাখা আয়োজিত জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনায় তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
তারেক বলেন, প্রকৃত ইতিহাস বলার কারণে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়া হয়েছে, তবে এ মামলা হওয়া উচিত শেখ মুজিবুর রহমানের নামে কারণ তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন।
এ সময় মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন তোলেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান।
তারেক রহমানের দাবি, তার বাবা জিয়াউর রহমান শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক কিংবা প্রথম রাষ্ট্রপতিই ছিলেন না, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্টও ছিলেন।
তিনি দাবি করেন, জিয়াউর রহমান জোর করে ক্ষমতা দখল করেননি এবং জাতীয় চার নেতা হত্যার সঙ্গে তার বাবার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। নিজের বক্তব্যের পক্ষে নানা তথ্য এবং যুক্তি তুলে ধরেন।
স্থানীয় সরকারবিষয়ক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জেলহত্যার সঙ্গে জিয়া জড়িত বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার জবাবে তারেক রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ নিজেরাই জেলহত্যা দিবস পালন করে ৩ নভেম্বর। ওই হত্যাকাণ্ডের আগের দিন ২ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে সেনানিবাসের বাসায় গৃহবন্দী করেছিলেন।
তিনি দাবি করেন, জিয়া ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করেননি। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক এটি জারি করেছিলেন।
বর্তমান সরকারকে অবৈধ উল্লেখ করে তারেক বলেন, এই সরকার দাবি করছে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করেছে। অথচ গত ১ নভেম্বর সারা দেশে বিদ্যুতের সমস্যা দেখা দিলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছিল পাঁচ হাজার মেগাওয়াট এবং আমদানি করা বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল ৫০০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে সরকার প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বর্তমান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ‘জঙ্গি ইনু’ আখ্যায়িত করে তারেক রহমান বলেন, ‘এই ইনু বাহিনী ১৯৭৫-এ শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পটভূমি তৈরি করেছিল এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল। সে কাজে ব্যর্থ হয়ে তারা এখন মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে জিয়ার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।’
তারেক বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আগস্ট থেকে নভেম্বর—এই কয়েকটি মাস ছিল ঘটনাবহুল এবং বিপৎসংকুল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা, সেনাবাহিনীতে চলে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান, খালেদ মোশাররফসহ সেনা অফিসার হত্যা, তাহের-ইনু চক্রের ষড়যন্ত্র এবং সিপাহী-জনতার সফল গণ-অভ্যুত্থানের পথ ধরে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।