আদালত

মানবতাবিরোধী অপরাধ

সুবহানের মামলার রায় যেকোনো দিন

আব্দুস সুবহানের
আব্দুস সুবহানের

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামাতের পিস কমিটির সেক্রেটারি আব্দুস সুবহানের (সুবহান মাওলানা) মামলার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হবে।

বৃহস্পতিবার মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় রায় ঘোষণা জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রেখেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

সকালে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষে সুবহানের বিরুদ্ধে পাল্টা ও সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।

চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল জানায়, মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় যেকোনো দিন রায় ঘোষণা করা হবে।

এর আগে গত ১৭ থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৮ কার্যদিবসে সুবহানের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী।

এদিকে, গত ৫ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ও বৃহস্পতিবার আট কার্যদিবসে সুবহানের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন।

গত ৭ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুবহানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন দুই তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও মো. নূর হোসাইনসহ রাষ্ট্রপক্ষের ৩১ জন সাক্ষী। তাদের মধ্যে অভিযোগভিত্তিক ঘটনার ২৭ সাক্ষী হলেন- সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী আ ত ম শাহিদুজ্জামান নাসিম, শহীদপুত্র মুক্তিযোদ্ধা তহুরুল আলম মোল্লা, মো. আবু আসাদ, রুস্তম আলী, মো. ইসরাইল, কোরবান আলী, শহীদ জায়া জাহানারা বেগম, আশরাফ উদ্দিন মিয়া, মো. রিয়াজ উদ্দিন মন্ডল, সানোয়ারা খাতুন, মো. ফজলুর রহমান ফান্টু, আব্দুর রহমান সরদার, শহীদ পরিবারের সদস্য মো. আব্দুল মতিন, মো. আজিজুল সরদার, মমতাজ উদ্দিন মন্টু, আক্কাছ শেখ, শহীদপুত্র আলী রানা শেখ, আব্দুল আজিজ, নিজাম উদ্দিন খান, হোসেন সরদার, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদপুত্র মো. শহিদুল্লাহ শহিদ, এসএম সামছুল আলম, মো. খোরশেদ আলম, শহীদপুত্র মো. সামছুল আলম, আবদুল বাতেন, মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মোঃ ফজলুল হক এবং এস কে শহীদুল্লাহ।

জব্দ তালিকার দুই সাক্ষী হচ্ছেন : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার গ্রন্থাগারিক আনিসুর রহমান ও বাংলা একাডেমির সহকারী গ্রন্থাগারিক এজাবউদ্দিন মিয়া।

আর সুবহানের পক্ষে ৩ জন সাক্ষী সাফাই সাক্ষ্য দেয়ার কথা থাকলেও কোনো সাফাই সাক্ষী হাজির করেননি আসামিপক্ষ।

তার বিচারিক কার্যক্রম:

গত ১ এপ্রিল সুবহানের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন।

গত ২৭ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-১ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করেন।

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ষড়যন্ত্রসহ ৮ ধরনের ৯টি মানবতাবিরোধী অপরাধে সুবহানের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।

গত বছরের ২৩ অক্টোবর ও ২৪ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের বিপক্ষে ও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে আসামিপক্ষে শুনানি করেন সুবহানের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান।

অন্যদিকে ৯ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন।

গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সুবহানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ১৫ সেপ্টেম্বর সুবহানের বিরুদ্ধে ৮৬ পৃষ্ঠার ওই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেন প্রসিকিউশন।

তদন্ত শুরু

২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে সুবহানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর তদন্ত কাজ সম্পন্ন করেন তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারী কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও মো. নূর হোসাইন এ মামলার তদন্তকাজ সম্পন্ন করেন। ওই দিনই তদন্ত সংস্থা তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেন। এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেন প্রসিকিউশন।

তদন্তের স্বার্থে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর সেফহোমে নিয়ে সুবহানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্ত সংস্থা।

গ্রেপ্তার:

২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সকালে টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে সুবহানকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই রাতেই তাকে পাবনা কারাগারে নেওয়া হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আবদুস সুবহানকে আটক দেখানোর আদেশ চান আদালতের কাছে। ২৬ সেপ্টেম্বর পাবনা কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয় সুবহানকে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশনের আবেদন আমলে নিয়ে সুবহানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

সুবহানের বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ:

পাবনার সুজানগর উপজেলার মানিকহাটি ইউনিয়নের তৈলকুণ্ডি গ্রামে জন্ম নেওয়া সুবহান পাকিস্তান আমলে পাবনা জেলা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আমির এবং সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সূরা সদস্য ছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে পাবনা জেলায় হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করেন আব্দুস সুবহান। পরে তিনি পাবনা জেলা পিস কমিটির সেক্রেটারি এবং পরবর্তীতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।

তার নেতৃত্বে পাবনা জেলার বিভিন্ন থানায় পিস কমিটি, রাজাকার আলবদর, আলশামস ও মুজাহিদ বাহিনী গঠিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি বিভিন্ন থানায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের নামের তালিকা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে সরবরাহ করতেন। সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের নেতৃত্ব দিয়ে এবং সঙ্গে থেকে তাদের হত্যা ও গণহত্যায় অংশও নিতেন।

ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মিটিং করে স্বাধীনতাবিরোধী বক্তব্য দিতেন এবং পাকিস্তান সরকারের পক্ষে মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে স্লোগানও দিতেন এই জামায়াত নেতা। পরে মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে ইয়াহিয়া সরকারের পতন দেখে গোলাম আযমের সঙ্গে তিনি পাকিস্তানে পালিয়ে যান।

সুবহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাবনা জেলার বিভিন্ন থানায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের নিয়ে গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক নির্যাতন, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে-

অভিযোগ-১: একাত্তরে সহযোগী জামায়াত নেতা ও বিহারিদের নিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে জামে মসজিদে আশ্রয় নেওয়া স্বাধীনতাকামী মানুষদের অপহরণ করে হত্যা করেন সুবহান।

অভিযোগ-২: ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সুবহানের নেতৃত্বে ও উপস্থিতিতে ঈশ্বরদীর যুক্তিতলা গ্রামে হামলা চালিয়ে লুটপাটসহ ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে তিনজনকে গুরুতরভাবে আহত এবং পাঁচজন নিরস্ত্র লোককে হত্যা করা হয়।

অভিযোগ-৩: ১৯৭১ সালের ১৬ মে ঈশ্বরদীর অরণখোলা গরুর হাট থেকে দুইজনকে অপহরণ করে পাবনার ঈশ্বরদীতে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করেন সুবহান।

অভিযোগ-৪: ২ মে সুবহানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঈশ্বরদীর সাহাপুর গ্রামে অসংখ্য বাড়ি-ঘরে লুটপাট ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং কয়েকজনকে হত্যা করে।

অভিযোগ-৫: ১১ মে সুবহানের নেতৃত্বে ও উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পাবনা সদর থানার কুলনিয়া ও দোগাছি গ্রামে হামলা চালিয়ে সাতজন নিরীহ-নিরস্ত্র, স্বাধীনতাকামী লোককে হত্যা এবং কয়েকটি বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়।

অভিযোগ-৬: ১২ মে সুবহানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি বিরাট বহর সুজানগরের কয়েকটি গ্রামে হামলা চালিয়ে তিন-চারশ’ মানুষকে হত্যা এবং বিভিন্ন বাড়ি-ঘরে লুটপাট চালায় ও পুড়িয়ে দেয়।

অভিযোগ-৭: ২০ মে সুবহানের নেতৃত্বে পাবনা সদর থানার ভাড়ারা গ্রামে ১৮ জনকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। শহীদদের মধ্যে একজনকে ওই গ্রামের একটি স্কুলে হত্যা করা হয়। বাকি ১৭ জনকে সদর থানার নূরপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ে নির্যাতনের পরে আটঘরিয়া থানার দেবোত্তর বাজারের পাশে বাঁশবাগানে গুলি করে হত্যা করা হয়।

অভিযোগ-৮: ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে আতাইকুলা থানার (সাবেক পাবনা সদর থানা) দুবলিয়া বাজার থেকে দুইজন স্বাধীনতাকামী লোককে অপহরণ করে কুচিয়ামাড়া গ্রামে একটি মন্দিরের ভেতরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেন সুবহান।

অভিযোগ-৯: ৩০ অক্টোবর রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে ঈশ্বরদীর বেতবাড়িয়া গ্রামে হামলা চালিয়ে কয়েকটি বাড়িতে লুটপাট চালিয়ে পুড়িয়ে দেন এবং চারজনকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেন।

দেশটিভি/আরসি
দেশ-বিদেশের সকল তাৎক্ষণিক সংবাদ, দেশ টিভির জনপ্রিয় সব নাটক ও অনুষ্ঠান দেখতে, সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল:

এছাড়াও রয়েছে

আল আমিনের তালাক: সন্তান নিয়ে আদালতে স্ত্রী

অস্ত্র মামলা: জি কে শামীমসহ ৮ জনের যাবজ্জীবন

আবেদন করলে খালেদা জিয়ার আবারো মুক্তির মেয়াদ বাড়বে: আইনমন্ত্রী

রুবেল-বরকতের অর্থপাচার মামলা ফের তদন্তের নির্দেশ আদালতের

জাহালমকে পাঁচ লাখ টাকা দিলো ব্র্যাক ব্যাংক

৮৫ নির্বাচন কর্মকর্তাকে চাকরিতে পুনর্বহালের আদেশ বাতিল

সরকারি কর্মচারীদের গ্রেপ্তারে পূর্বানুমতি বাতিলের রায় স্থগিত

ডেসটিনির চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশিদের জামিন

সর্বশেষ খবর

স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার নারী দিবস উদযাপন

শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ করলেন মোস্তাফিজুর রহমান

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইউল্যাব’ শিক্ষার্থীদের ফটোওয়াক

ভান্ডারিয়া ও মঠবাড়িয়ায় পৌর প্রশাসক নিয়োগ