মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে আলবদর কমান্ডার আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখে বুধবার আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে।
বুধবার মুজাহিদের ১৯১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর আগে রায়ে স্বাক্ষর করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ আপিল মামলার রায় প্রদানকারী চার বিচারপতি। অন্য বিচারপতিরা হচ্ছেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
বিকেলে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম
গত ১৬ জুলাই প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে ৪ সদস্যের আপিল বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে চার সদস্যের একই আপিল বেঞ্চ এ রায় দেয়।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এখন দেশের শীর্ষ দুই যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদ-সাকা চৌধুরীর প্রাণদণ্ড কার্যকর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালো।
আইনজীবীরা জানান, এ রায় কার্যকর করতে আর মাত্র তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
বিধি মোতাবেক রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ (পুর্নবিবেচনা) করতে পারবেন আসামি ও রাষ্ট্র উভয়পক্ষই। আজ বুধবার মুজাহিদ ও সাকা দু’জনের চূড়ান্ত রায় প্রকাশের পর তাদের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর তারা রিভিউ করা হবে।
রিভিউ করার পর সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তির পর সর্বোচ্চ দণ্ড বহাল থাকলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন আসামি। প্রাণভিক্ষা না চাইলে সুবিধামতো সময়ে দণ্ড কার্যকর করবে রাষ্ট্র।
এ নিয়ে ঘোষিত ৫টি চূড়ান্ত রায়ের মধ্যে ৪টির পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে সর্বোচ্চ আদালত। প্রকাশিত অন্য দু’টি পূর্ণাঙ্গ রায় অনুসারে জামাতের দুই সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড এরইমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। অন্যদিকে জামাতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে আপিল বিভাগ। সাঈদীর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সর্বোচ্চ সাজা পুনর্বহালের আরজিতে রিভিউ আবেদন জানাবেন বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
আর ট্রাইব্যুনাল আপিল বিভাগে আসা ১৫টি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার মধ্যে ৮টির শুনানি শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। বাকি দু’টি আপিল শুনানি অকার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের রায়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামাতের সাবেক আমির গোলাম আযম ও আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপির সাবেক নেতা সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীম মৃত্যুবরণ করায় তাদের আপিল আবেদনের ওপর শুনানি হবে না।
ফিরে দেখা কিছু কথা:
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ আল বদর বাহিনীর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও অক্টোবরের দিকে তিনি প্রধানের দায়িত্ব পান। বিজয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে সরাসরি জড়িত ছিল জামাতের এ নেতা ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে সরাসরি জড়িত থাকাসহ বিভিন্ন সময় মুক্তিযোদ্ধা নির্যাতন ক্যাম্প পরিদর্শন, গ্রামের পর গ্রাম জালিয়ে দেয়া, নারী ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭টি অভিযোগ আনা হয় মুজাহিদের বিরুদ্ধে। ৭টি অভিযোগের পাঁচটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৩ সালে ১৭ জুলাই তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বাকি ২টিতে পাঁচ বছর ও যাবজ্জীবন এবং অন্য দুটি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় তাকে।
বিগত ২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে অঘাত দেয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় মুজাহিদকে। এরপর ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্তের পর তার বিরুদ্ধে ৬ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭টি অভিযোগ সুনির্দিষ্ট করা হয়।
গত ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মুজাহিদের বিরদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই বছর ১১ আগস্ট খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে মুজাহিদ। তবে সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় আপিল করেনি রাষ্ট্রপক্ষ।
এতে গত ২৯ এপ্রিল মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলবদর কমান্ডার আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের নথিপত্র পাঠের মধ্যে দিয়ে আপিলের শুনানি শুরু হয়।
৯ কার্যদিবস শুনানি শেষে গত ২৭ মে আপিলের রায় আগামী ১৬ জুন মঙ্গলবার দেয়ার দিন ধার্য করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে ৪ সদস্যের আপিল বেঞ্চ।
ফিরে দেখা বিচার নিয়ে কিছু কথা:
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগের মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে গ্রেপ্তার করার পর ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলার শুনানি শেষে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের ২১ জুন ট্রাইব্যুনালে মুজাহিদের বিচার শুরু হয়।
২০১৩ সালের ১৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালে এ জামাত নেতার ফাঁসির রায় দেয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ১১ আগস্ট আপিল করে মুজাহিদ।
রাষ্ট্রপক্ষ আপিল না করলেও শুনানিতে অংশ নিয়ে দণ্ড বহাল রাখতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। গত ২৯ এপ্রিল শুনানি শুরুর পর মঙ্গল ও বুধবার যুক্তি উপস্থাপনসহ নয় দিন আপিলের ওপর শুনানি গ্রহণ করে বেঞ্চের চার বিচারপতি।
রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আর তার সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যার্টনি জেনারেল মো. রশির আহমেদ।
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এস এম শাজাহান সঙ্গে ছিলেন শিশির মনির।
আপিলের চতুর্থ রায়:
ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত হওয়া ১৯টি মামলার রায়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৩টিতে দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া আবুল কালাম আযাদ, চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান এবং ফরিদপুরের জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকার পলাতক থাকায় এ সুযোগ পাননি।
আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জাতীয় পার্টির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল জব্বারও একই কারণে আপিল করতে পারেননি।
মুজাহিদের মামলাসহ চূড়ান্ত রায় এসেছে চার মামলায়।
এর আগে গত ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে সর্বোচ্চ সাজা দিলে চলতি বছর ১১ এপ্রিল তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জামাতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তার ঠিক এক বছর আগে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আপিল বিভাগ। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
আপিল শুনানি চলাকালেই মৃত্যু হয়েছে জামাতের সাবেক আমির রাজাকার শিরোমনি গোলাম আযম এবং বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের। এছাড়া ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জামাতের আরেক আমির কারাবন্দি থাকায় রাজাকার ইউসুফ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিল মঙ্গলবার আদালতের কার্যতালিকায় আসে।