মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ডের বহাল রেখে আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায় বুধবার প্রকাশ করা হয়েছে।
সাকা চৌধুরীর ২১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর আগে রায়ে স্বাক্ষর করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ আপিল মামলার রায় প্রদানকারী চার বিচারপতি। অন্য বিচারপতিরা হচ্ছেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত ২৯ জুলাই চট্টগ্রাম অঞ্চলের নৃশংসতম মানবতাবিরোধী অপরাধের হোতা সাকা চৌধুরীর মামলার সংক্ষিপ্ত চূড়ান্ত রায় দেয় আপিল বিভাগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে চার সদস্যের একই আপিল বেঞ্চ এ রায় দেন।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এখন দেশের শীর্ষ দুই যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদ-সাকা চৌধুরীর প্রাণদণ্ড কার্যকর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালো বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। তারা জানান, এ রায় কার্যকর করতে আর মাত্র তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
বিধি মোতাবেক রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ (পুর্নবিবেচনা) করতে পারবেন আসামি ও রাষ্ট্র উভয় পক্ষই। দু’জনের চূড়ান্ত রায় প্রকাশের পর পরই বুধবার বিকেলে তাদের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর তারা রিভিউ করবেন।
রিভিউ করার পর সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তির পর সর্বোচ্চ দণ্ড বহাল থাকলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন আসামিরা। প্রাণভিক্ষা না চাইলে সুবিধামতো সময়ে দণ্ড কার্যকর করবে রাষ্ট্র।
বিচার নিয়ে যত কথা:
এর আগে ২৯ জুলাই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ৪ সদস্যের বেঞ্চ সাকা চৌধুরীর ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে।
২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৩টি অভিযোগের ৯টিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
একই বছরের ২৯ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় সালাউদ্দিন কাদেরের খালাস চেয়ে আপিল দায়ের করেন তার আইনজীবীরা। আপিল আবেদনে মোট ১ হাজার ৩২৩ পৃষ্ঠার নথিপত্রের ডকুমেন্টসহ দাখিল করা হয়। ৪টি অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেনি।
অভিযোগ গুলো হলো:
১. কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যা,
২. সুলতানপুরের নেপাল চন্দ্র ও আরো ৩ জনকে হত্যা,
৩. উনসত্তরপাড়ায় ৭০ জনকে হত্যা,
৪. চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর হোসেন ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে নির্যাতন ও হত্যা।
রায়ে বলা হয়, সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২৩টি অভিযোগ এনেছে, যার মধ্যে ৯টি (২ থেকে ৮ এবং ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগ) প্রমাণিত হয়েছে।
এর মধ্যে ৩য় অভিযোগে নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা, ৫ম অভিযোগে সুলতানপুর বণিকপাড়া ও ৬ষ্ঠ অভিযোগে ঊনসত্তরপাড়ায় গণহত্যা, ৮ম অভিযোগে হাটহাজারীর আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মোজাফফর ও তার ছেলেকে অপহরণ করে খুনের দায়ে সাকা চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়।
২য়, ৪র্থ ও ৭ম অভিযোগে হত্যা, গণহত্যার পরিকল্পনা, সহযোগিতা এবং লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও দেশান্তরে বাধ্য করার ঘটনায় সাকা চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ২০ বছর করে ৬০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়।
১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগে অপহরণ ও নির্যাতনের দায়ে তাকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। বাকি ১৪টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সেগুলো থেকে তাকে খালাস দেয় ট্রাইব্যুনাল।
এছাড়াও মধ্যগহিরার গণহত্যা, জগৎমাল্লপাড়ার গণহত্যা ও সতিশ চন্দ্র পালিতকে হত্যার অভিযোগে দেয়া হয়েছে ২০ বছর করে কারাদণ্ড। আর মুক্তিযুদ্ধের ৩ সংগঠককে অপহরণ, আটক, নির্যাতন এবং সালেহ্উদ্দিনকে অপহরণের দায়ে তাকে দেয়া হয় ৫ বছর করে কারাদণ্ড।
খালাস দেয়া হয় ৮টি অভিযোগ থেকে আর বাকি ৬টি অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির না করতে না পারায় সেগুলো রায়ের জন্য বিবেচনায়ই নেয়নি ট্রাইব্যুনাল।
চলতি বছরের ১৬ জুন আপিলের শুনানি শুরু হয় শেষ হয় ৭ জুলাই। ওই দিন আদালত রায় ঘোষণার জন্য ২৯ জুলাই তারিখ ধার্য করে।
হরতালে গাড়ি পোড়ানোর এক মামলায় ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর সাকা চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তার বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল।
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী চট্টগ্রামের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা থেকে নিরীহ মানুষদের ধরে অমানবিক নির্যাতনের অন্যতম হোতা ছিলেন এ যুদ্ধাপরাধী।
গুডস্ হিল নামে পরিচিত এ বাড়িটি ১৯৭১ এ ছিল মুক্তিকামী বাঙালির জন্য আতংকের নাম। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা থেকে নিরীহ মানুষদের ধরে এনে অমানবিক নির্যাতন করা হতো এখানে।
বাড়িটি পৈত্রিক সূত্রে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। কোন দল বা সহযোগী সংগঠনের হয়ে নয়, একাই বাঙালির স্বাধীনতার বিরুদ্ধে গিয়ে পাকিস্তানিদের সহায়তা করেছেন সাকা চৌধুরী। মেতে উঠে ছিলেন হত্যার হোলিখেলায়।