মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও জামাত নেতা আলী আহসান মুজাহিদের মৃত্যু পরোয়ানা কারা কতৃর্পক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর আগে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বৃহস্পতিবার সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের পৃথক দুই মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক এবং বিচারিক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী।
এরপর মৃত্যু পরোয়ানা জারির পর তা লাল কাপড়ে মুড়িয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। মৃত্যু পরোয়ানার একটি কপি স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছেও পাঠানো হয়। আইন অনুসারে কারা কর্তৃপক্ষ হাতে পাওয়ার পর মৃত্যু পরোয়ানা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পড়ে শোনানো হয়।
এরপর আসামিরা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইবেন কি-না অথবা রিভিউ আবেদন করবেন কি-না তা তাদের কাছে জানতে চাওয়া হবে। যদি ক্ষমা না চাইলে ফাঁসি কার্যকর করার শেষ ধাপগুলো সম্পন্ন করা হবে।
গতকাল (বুধবার) সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের বহাল রেখে আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায় প্রকাশ করে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের দিন থেকে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করার জন্য ১৫ দিনের সময় পাবেন আসামিপক্ষ।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিভিউ করেন তাহলে ফাঁসি কার্যকর প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে। রিভিউ নিষ্পত্তির পর বা রিভিউ খারিজ হলে এ প্রক্রিয়া ফের শুরু হবে।
গত ১৬ জুন একাত্তরের কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনীর প্রধান মুজাহিদ এবং ২৯ জুলাই চট্টগ্রাম অঞ্চলের নৃশংসতম মানবতাবিরোধী অপরাধের হোতা সাকা চৌধুরীর মামলার সংক্ষিপ্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে আপিল বিভাগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ৪ সদস্যের একই আপিল বেঞ্চ পৃথক পৃথক এ রায় দেয়।
সাকা চৌধুরীর বিচার নিয়ে যতো কথা:
গত ২৯ জুলাই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ৪ সদস্যের বেঞ্চ সাকা চৌধুরীর ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে।
২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৩টি অভিযোগের ৯টিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
একই বছরের ২৯ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় সালাউদ্দিন কাদেরের খালাস চেয়ে আপিল দায়ের করেন তার আইনজীবীরা। আপিল আবেদনে মোট ১ হাজার ৩২৩ পৃষ্ঠার নথিপত্রের ডকুমেন্টসহ দাখিল করা হয়। ৪টি অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেনি।
অভিযোগ গুলো হলো:
১. কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যা,
২. সুলতানপুরের নেপাল চন্দ্র ও আরো ৩ জনকে হত্যা,
৩. উনসত্তরপাড়ায় ৭০ জনকে হত্যা,
৪. চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর হোসেন ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে নির্যাতন ও হত্যা।
রায়ে বলা হয়, সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২৩টি অভিযোগ এনেছে, যার মধ্যে ৯টি (২ থেকে ৮ এবং ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগ) প্রমাণিত হয়েছে।
এর মধ্যে ৩য় অভিযোগে নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা, ৫ম অভিযোগে সুলতানপুর বণিকপাড়া ও ৬ষ্ঠ অভিযোগে ঊনসত্তরপাড়ায় গণহত্যা, ৮ম অভিযোগে হাটহাজারীর আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মোজাফফর ও তার ছেলেকে অপহরণ করে খুনের দায়ে সাকা চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়।
২য়, ৪র্থ ও ৭ম অভিযোগে হত্যা, গণহত্যার পরিকল্পনা, সহযোগিতা এবং লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও দেশান্তরে বাধ্য করার ঘটনায় সাকা চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ২০ বছর করে ৬০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়।
১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগে অপহরণ ও নির্যাতনের দায়ে তাকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। বাকি ১৪টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সেগুলো থেকে তাকে খালাস দেয় ট্রাইব্যুনাল।
এছাড়াও মধ্যগহিরার গণহত্যা, জগৎমাল্লপাড়ার গণহত্যা ও সতিশ চন্দ্র পালিতকে হত্যার অভিযোগে দেয়া হয়েছে ২০ বছর করে কারাদণ্ড। আর মুক্তিযুদ্ধের ৩ সংগঠককে অপহরণ, আটক, নির্যাতন এবং সালেহ্উদ্দিনকে অপহরণের দায়ে তাকে দেয়া হয় ৫ বছর করে কারাদণ্ড।
খালাস দেয়া হয় ৮টি অভিযোগ থেকে আর বাকি ৬টি অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির না করতে না পারায় সেগুলো রায়ের জন্য বিবেচনায়ই নেয়নি ট্রাইব্যুনাল।
চলতি বছরের ১৬ জুন আপিলের শুনানি শুরু হয় শেষ হয় ৭ জুলাই। ওই দিন আদালত রায় ঘোষণার জন্য ২৯ জুলাই তারিখ ধার্য করে।
হরতালে গাড়ি পোড়ানোর এক মামলায় ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর সাকা চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তার বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল।
অপরদিকে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগের মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে গ্রেপ্তার করার পর ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলার শুনানি শেষে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের ২১ জুন ট্রাইব্যুনালে মুজাহিদের বিচার শুরু হয়।
২০১৩ সালের ১৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালে এ জামাত নেতার ফাঁসির রায় দেয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ১১ আগস্ট আপিল করে মুজাহিদ।
রাষ্ট্রপক্ষ আপিল না করলেও শুনানিতে অংশ নিয়ে দণ্ড বহাল রাখতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। গত ২৯ এপ্রিল শুনানি শুরুর পর মঙ্গল ও বুধবার যুক্তি উপস্থাপনসহ নয় দিন আপিলের ওপর শুনানি গ্রহণ করে বেঞ্চের চার বিচারপতি।
রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আর তার সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যার্টনি জেনারেল মো. রশির আহমেদ।
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এস এম শাজাহান সঙ্গে ছিলেন শিশির মনির।
মুজাহিদ নিয়ে কিছু কথা:
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ আল বদর বাহিনীর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও অক্টোবরের দিকে তিনি প্রধানের দায়িত্ব পান। বিজয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে সরাসরি জড়িত ছিল জামাতের এ নেতা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে সরাসরি জড়িত থাকাসহ বিভিন্ন সময় মুক্তিযোদ্ধা নির্যাতন ক্যাম্প পরিদর্শন, গ্রামের পর গ্রাম জালিয়ে দেয়া, নারী ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭টি অভিযোগ আনা হয় মুজাহিদের বিরুদ্ধে। ৭টি অভিযোগের পাঁচটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৩ সালে ১৭ জুলাই তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বাকি ২টিতে পাঁচ বছর ও যাবজ্জীবন এবং অন্য দুটি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় তাকে।
২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে অঘাত দেয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় মুজাহিদকে। এরপর ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্তের পর তার বিরুদ্ধে ৬ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭টি অভিযোগ সুনির্দিষ্ট করা হয়।
গত ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মুজাহিদের বিরদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই বছর ১১ আগস্ট খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে মুজাহিদ। তবে সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় আপিল করেনি রাষ্ট্রপক্ষ।
এতে গত ২৯ এপ্রিল মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলবদর কমান্ডার আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের নথিপত্র পাঠের মধ্যে দিয়ে আপিলের শুনানি শুরু হয়।
৯ কার্যদিবস শুনানি শেষে গত ২৭ মে আপিলের রায় আগামী ১৬ জুন মঙ্গলবার দেয়ার দিন ধার্য করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে ৪ সদস্যের আপিল বেঞ্চ।