সিলেটের চাঞ্চল্যকর শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলার রায়ে ৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তরা হলেন: কামরুল ইসলাম, ময়না, তাজউদ্দিন বাদল, জাকির হোসেন।
রায়ের পর শিশু রাজনের বাবা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তা কার্যে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
রায়ে মামলার ১৩ আসামির মধ্যে খালাস পান তিন জন। কামরুলের তিন ভাইয়ের হয়েছে সাত বছর করে কারাদণ্ড। বাকিদের মধ্যে একজনের যাবজ্জীবন এবং দুইজনের একবছর কারাদণ্ড।
গত ৮ জুলাইয়ের ওই হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরুর পর মাত্র ১৭ কার্যদিবসে ঘোষিত হলো। দেশজুড়ে আলোচিত এ হত্যা মামলার রায়। গত ২২ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্যেদিয়ে শুরু হয় মামলার বিচার।
গত ২৭ অক্টোবর মামলার দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে একই বিচারক রায়ের দিন ঠিক করে দেন।
রায়:
রায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলো- ময়না চৌকিদার, তাজউদ্দিন আহমদ বাদল ও জাকির হোসেন পাভেল আহমদ।
রায়ে খালাস পেয়েছেন- ফিরোজ মিয়া, আজমত উল্লাহ ও রুহুল আমিন।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে নুর মিয়ার। সাত বছর করে কারাদণ্ড হয়েছে- কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ও শামীম আহমদের। একবছর করে দণ্ড হয়েছে দুলাল আহমদ ও আয়াজ আলীর।
কামরুলের আরেক ভাই শামীম আহমেদ ও জাকির হোসেন পাভেল আহমেদ পলাতক রয়েছেন।
রোববার বেলা পৌনে ১২টার দিকে এ হত্যা মামলার ৭৬ পৃষ্ঠার রায় পড়া শুরু করেন মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধা।
এ হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া ১৫ কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়। ১৬তম কার্যদিবসে রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজনের মা লুবনা বেগমকে নিয়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন বাবা আজিজুল রহমান আলম। বাদী ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও আদালতে উপস্থিত হন।
এদিকে, রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে বাড়তি নিরাপত্তায় পোশাকে-সাদা পোশাকে বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে মোতায়েন করা হয়।
বিচার নিয়ে ফিরে দেখা:
গত ২৭ অক্টোবর শিশু রাজন হত্যা মামলার রায়ের দিন ঠিক করে আদালত। ওইদিন সকালে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ৩য় দিনের মতো করা হয়।
এ মামলার ১৩ আসামির মধ্যে ৪ জনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলে। দুপুর ১২টার দিকে মামলার প্রধান আসামি কামরুলসহ ১১ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধা এ বিচারিক কাযর্ক্রম শুরু করেন। এ মামলায় এ পর্যন্ত ৩৬ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। হত্যা মামলার ১১ আসামিকে হাজির করা হলে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হয়।
গত ২০ অক্টোবর সিলেটে রাজন হত্যা মামলার ১১ জন সাক্ষীর পুণরায় সাক্ষ্য গ্রহণের অনুমতি দেয় আদালত। মঙ্গলবার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি কামরুলের আইনজীবী আলী হায়দারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তা মঞ্জুর করে।
এর আগে সোমবার হত্যা মামলার শুনানির দিন আগামী ২০ অক্টোবর ধার্য করে আদালত। সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধার আদালতে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে এ দিন নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে আদালত আগামী ২৫ অক্টোবর মামলার যুক্তিতর্কের দিনও নির্ধারণ করে।
গোয়ান্দা পুলিশের পরিদর্শক সুরঞ্জিত তালুকদারসহ মামলার ৩৬ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। মামলার ১৩ আসামির মধ্যে জেলহাজতে থাকা প্রধান আসামি সৌদি প্রবাসি কামরুলসহ ১১ জন আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
১৮ অক্টোবর (রোববার) সিলেটে শিশু সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় শেষ সাক্ষীর জবানবন্দি নেয় আদালত।
রোববার মহানগর দায়রা জজ আকবর হোসেন মৃধার আদালতে সিলেট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সুরঞ্জিত তালুকদারের সাক্ষ্য নেয়া হয়।
পাবলিক প্রসিকিউটর মফুর আলী বলেন, রাজন হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কর্মকর্তা সুরঞ্জিত এ মামলার ৩৬তম ও শেষ সাক্ষী। মোট ৩৮ জন সাক্ষী তালিকাভুক্ত থাকলেও অন্যরা আসে নাই। তবে আদালত পর্যাপ্ত মনে করায় তাদের সাক্ষ্য আর নেয়া হবে না।
সাক্ষ্যগ্রহণের সময় মামলার প্রধান আসামি কামরুল ইসলামকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিল। সৌদিআরব থেকে তাকে দেশে ফেরত আনার পর এ বিচারিক আদালতে হাজির করা হয়।
কামরুলসহ ১১ আসামিকে আদালতে নেয়ার সময় সেখানে উপস্থিত জনতা ‘ফাঁসি চাই, ‘ফাঁসি চাই’বলে স্লোগান দেন।
এ মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা সিলেট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সুরঞ্জিত তালুকদারসহ তিনজন। তারা সাক্ষ্য দেয়ার পরই প্রক্রিয়া শেষ হয়।
সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) আবদুল আহাদ জানান, মামলার মোট ৩৮ সাক্ষীর মধ্যে ৩৫ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়।
গত বৃহস্পতিবার রাজন হত্যা মামলার প্রধান আসামি সৌদি আরবে থাকা কামরুল ইসলামকে দেশে ফিরিয়ে আনে পুলিশের একটি দল।
এর আগে ৯ম দিনের মতো এ মামলায় সাক্ষ্য দেন ৬ পুলিশ কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার মহানগর দায়রা জজ আকবর হোসেন মৃধার আদালতে পূর্ব নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী শেষ দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে পুনরায় নতুন তারিখ ধার্য করে আদালত।
পুলিশ কর্মকর্তারা হলেন: সিলেট মহানগরীর জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার হোসেন, রাজন হত্যা মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা একই থানার বরখাস্তকৃত (ওসি-তদন্ত) আলমগীর হোসেন, একই থানার এসআই আরিফুল আমিন, এসআই শামীম আকঞ্জি, এএসআই সোহেল রানা ও সুনামগঞ্জের দিরাই থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) মহাদেব বাছাড়।
এর আগে বুধবার দুপুর ১২টা থেকে গিয়াস মেম্বারসহ আরো ৪জনের সাক্ষ্যগ্রহণ নেয়া হয়। সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধা তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন।
আদালতে সাক্ষ্য প্রদানকারীরা হচ্ছে: শেখপাড়া এলাকার আলোচিত সেই গিয়াস মেম্বার, কুমারগাঁয়ের বাসিন্দা আফতাব উদ্দিন, আব্দুল করিম ও কুরবান আলী।
রাজনের বাবার নিযুক্ত আইনজীবী শওকত চৌধুরী জানান, ওইদিন ৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্যদিয়ে রাজন হত্যা মামলায় মোট ২১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়।
তিনি জানান, আগামীকাল ১৪ অক্টোবরও এ মামলায় টানা সাক্ষ্যগ্রহণ করবে আদালত।
এদিকে, রাজনকে পিটিয়ে হত্যাকারী মূল ঘাতক কামরুল আসলামকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সৌদি আরবে যান তিন পুলিশ কর্মকর্তা।
এর আগে গত রোববার দুপুরে সিলেটে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে আটক সকল আসামির উপস্থিতিতে সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধা। শিশু রাজনের ৩ প্রতিবেশি ওইদিন সাক্ষ্য দেন।
উল্লেখ, গত ৮ জুলাই ভোরে ‘চোর’ সন্দেহে শিশু রাজনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পৈচাশিক নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয় নির্যাতনকারীরা। প্রায় ২৮ মিনিটের সেই ভিডিও চিত্রটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নিহত রাজন সদর উপজেলার কান্দিরগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের আজিজুল ইসলামের (আলম) ছেলে। হত্যাকাণ্ডের পর মহানগরীর জালালাবাদ থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) বাদী হয়ে মুহিত আলমসহ অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
গত ১৬ আগস্ট সৌদি-আরবে আটক কামরুল ইসলামসহ ১৩ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে এ হত্যা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর সুরঞ্জিত তালুকদার।
এর আগে, মুহিত আলমসহ ৮ জন এ ঘটনায় আদালতে হত্যার দায় স্বীকার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
গত ২৪ আগস্ট আদালত এ মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। গত ২৫ আগস্ট জালালাবাদ থানা পুলিশ ৩ পলাতক আসামির মালামাল ক্রোক করে থানায় নিয়ে যান।
অবশেশে শেষ হলো শিশু রাজন হত্যাকাণ্ডের বিচার।