নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় করা দুটি মামলায় অভিযোগ গঠন হয়েছে।
সোমবার এই দুটি মামলায় জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে আসামি নূর হোসেন, তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ, এম এম রানাসহ ২৩ জন আসামি কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিল।
মামলার ৩৫ জন আসামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি ওয়াজেদ আলী অভিযোগ পড়ে শোনান। ৩৫ জন আসামির মধ্যে ১২ জন পলাতক, যারমধ্যে আট জন র্যা বের সদস্য।
আদালত ২৫ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্য নেয়ার দিন ধার্য করেছে। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ গঠনের দিন পেছানোর ও কোনো কোনো আসামির জামিন চেয়েছিল। আদালত ওই আবেদন নাকচ করে দিয়েছে।
এদিকে, আসামি নূর হোসেনের আরো ২টি চাঁদাবাজি মামলার অভিযোগ গঠনের জন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়েছে।
সোমবার নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম কেএম মহিউদ্দিন এ আদেশ দেন।
তার আইনজীবী খোকন সাহা জানান, একই সময় নূর হোসেনের পক্ষে ওই ২ মামলায় করা জামিনের আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন।
সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল এলাকার ইকবাল হোসেন ২০১৪ সালের ১০ জুন সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় নূর হোসেনসহ ছয় জনকে আসামি একটি মামলা করেন।
মামলার অভিযোগ বলা হয়েছে, ইকবালের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর মারধর করে নূর হোসেনের লোকজন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরবর্তীতে ছয় জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অপর মামলাটি দায়ের করেন আদমজী ইপিজেডের একটি প্যাকেজিং কারখানার মালিক আকরাম হোসেন ২০১৪ সালের ২৭ মে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় চাঁদাবাজির মামলাটি দায়ের করেন। এতে নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় বলা হয়, ২০১৩ সালের ২৫ মে আকরাম হোসেনের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদাবাজি দাবি করেন নূর হোসেন ও তার সহযোগীরা। ওই সময় ভয়ে তিনি মামলা করেননি। পরে সাত খুনের ঘটনায় নূর হোসেন ভারত পালিয়ে গেলে আকরাম এ মামলা করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নূর হোসেনসহ আট জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
উল্লেখ, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডের ফতুল্লার লামাপাড়া থেকে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে তাদের মরদেহ পাওয়া যায়।
ওই ঘটনায় কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী এবং আইবজীবী চন্দন সরকারের জামাতা দুটি মামলা করেন।
হত্যাকাণ্ডের প্রায় একবছর পর ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল নূর হোসেন এবং র্যা বের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
তবে অভিযোগপত্র থেকে পাঁচ আসামিকে বাদ দেয়ায় এবং প্রধান আসামি নূর হোসেনের জবানবন্দি ছাড়া অভিযোগপত্র আদালত আমলে নেয়ায় ‘নারাজি’ আবেদন করেন সেলিনা ইসলাম বিউটি।
আবেদনটি বিচারিক হাকিম আদালত ও জজ আদালতে খারিজ হয়ে গেলে বিউটি উচ্চ আদালতে যান। হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়, পুলিশ চাইলে মামলাটির ‘অধিকতর তদন্ত’ করতে পারে এবং ‘হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার’ ধারা যুক্ত করে নতুন করে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পরে।
এ মামলায় নূর হোসেন ও র্যা বের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন কারাগারে আটক রয়েছে।
নূর হোসেন ছাড়া বাকিরা হলেন- সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, এম এম রানা ও আরিফ হোসেন, র্যা ব সদস্য এসআই পূর্ণেন্দু বালা, এএসআই বজলুর রহমান ও আবুল কালাম আজাদ, হাবিলদার এমদাদুল হক ও নাসির উদ্দিন, কনস্টেবল শিহাব উদ্দিন ও বাবুল হাসান, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্সনায়েক হীরা মিয়া, বেলাল হোসেন, ল্যান্স কর্পোরাল রুহুল আমিন, সিপাহী আবু তৈয়ব, নুরুজ্জামান ও আসাদুজ্জামান নূর এবং নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দীপু, রহম আলী ও আবুল বাশার।
র্যা বের সার্জেন্ট এনামুল কবীর, এএসআই কামাল হোসেন, কর্পোরাল মোখলেছুর রহমান, সৈনিক আব্দুল আলিম, মহিউদ্দিন মুন্সী, আল আমিন শরীফ, তাজুল ইসলাম ও কনস্টেবল হাবিবুর রহমান পলাতক।
এছাড়া নূর হোসেনের আরেক সহযোগী বন্দর উপজেলার কুড়িপাড়া এলাকার সেলিম ভারতের কারাগারে আটক রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে নূর হোসেন। গত ২০১৪ সালের ১৪ জুন কলকাতায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই বছরের ১২ নভেম্বর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে কারাগারে।