রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ভবনের মালিক রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে আদালত।
আগামী ১৮ সেপ্টম্বর এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্যদিয়ে বিচারকাজ শুরু হবে।
সোমবার সকালে হত্যা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হবে কি না, এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামানের আদালতে এ শুনানি চলে।
এর আগে ১৪ জুন ঢাকা অদূরে সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের হওয়া ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় আসামি ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এ আদেশ দেন।
ওই সময় ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ঠিক রেখেছে আদালত।
রানা প্লাজা ধস ও বিচার নিয়ে কিছু কথা
গত ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আট তলা রানা প্লাজা ধসে নিহত হন এক হাজার ১৩৫ জন পোশাক শ্রমিক।
প্রাণে বেঁচে গেলেও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় আরো হাজারখানেক পোশাক শ্রমিককে। ঘটনার দিনই সাভার থানায় দুটি মামলা করা হয়। পরের বছর দুর্নীতি দমন কমিশন আরো একটি মামলা করে।
প্রথমটিতে হতাহতের ঘটনা উল্লেখ করে ভবনমালিক ও কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক ওয়ালী আশরাফ।
রাজউক কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনের দায়ের করা অপর মামলায় ভবনটির অবকাঠামো নির্মাণে ত্রুটি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়।
এ দীর্ঘ সময়ে রানা প্লাজা ঘটনা নিয়ে একটি স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ এবং কয়েকটি রিটের বিপরীতে আদেশ দেয় উচ্চ আদালত।
বিচার নিয়ে কিছু তথ্য:
গত ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে আট তলা রানা প্লাজা ভেঙে পড়লে শিল্পক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে।
এর মধ্যে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এসএম কুদ্দুস জামানের আদালতে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে হত্যা মামলাটি। এ মামলার ৪১ জন আসামির মধ্যে ১২ জন পলাতক, ছয় জন কারাগারে এবং বাকিরা জামিনে রয়েছেন।
ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় ১৮ আসামির মধ্যে ১১ জন জামিনে রয়েছেন। বাকিদের দুই জন কারাগারে এবং পাঁচ জন পলাতক।
হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনের এ দুই মামলায় গতবছরের ১ জুন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সহকারী সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম অভিযোগপত্র দেন।
ভিন্ন অভিযোগের দুটি মামলায়ই রানা, তার মা ও বাবাসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ওই বছর ৮ জুলাই ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পলাতক ছয় আসামির বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও হত্যা মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত ৫ সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে মঞ্জুরি আদেশ না থাকায় একাধিকবার শুনানি পেছানো হয়।
পরে ওই অনুমোদন ছাড়াই হত্যা মামলায় গত ২১ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পলাতক ২৩ আসামিকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করে বিচারিক আদালত।
এ মামলায় আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- সাভার পৌরসভার সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, পৌর নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা ইসলাম, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সাবেক উপ-প্রধান পরিদর্শক মো. আব্দুস সামাদ, উপ-প্রধান পরিদর্শক (সাধারণ, ঢাকা বিভাগ) মো. জামশেদুর রহমান, উপ-প্রধান পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম বিভাগের পরিদর্শক (প্রকৌশল) মো. ইউসুফ আলী, ঢাকা বিভাগের পরিদর্শক (প্রকৌশল) মো. সহিদুল ইসলাম, রাজউকের ইমারত পরিদর্শক মো. আওলাদ হোসেন, ইতার টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস, মো. শফিকুল ইসলাম ভূইয়া, মনোয়ার হোসেন বিপ্লব, মো. আতাউর রহমান, মো. আব্দুস সালাম, বিদ্যুৎ মিয়া, সৈয়দ শফিকুল ইসলাম জনি, রেজাউল ইসলাম, নান্টু কন্ট্রাকটার, মো. আব্দুল হামিদ, আব্দুল মজিদ, মো. আমিনুল ইসলাম, নয়ন মিয়া, মো. ইউসুফ আলী ও তসলিম।
এদের মধ্যে আব্দুস সামাদ, জামশেদুর রহমান, বেলায়েত হোসেন, ইউসুফ আলী ও সহিদুল ইসলাম সরকারি কর্মকর্তা।
অভিযোগপত্র গ্রহণের সময় পলাতক ২৩ জনের বাইরে অভিযোগপত্রভুক্ত ১৮ আসামির মধ্যে শুধু ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়া বাকিরা জামিনে রয়েছে।
উভয় মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অভিযোগপত্র গ্রহণের পর নতুন করে অনেক আসামি জামিন নিয়েছেন। ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় আসামিদের পক্ষে কাজ করছেন আইনজীবী শেখ বাহারুল ইসলাম। তিনি গত মার্চে এই মামলায় আসামি হিসেবে থাকা দুই সরকারি কর্মকর্তার জামিন করিয়েছেন।
হত্যা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা ৪১ জনকে আসামি করে যে অভিযোগপত্র দিয়েছেন, তাতে আসামিদের বিরুদ্ধে ‘পরিকল্পিত মৃত্যু ঘটানো’সহ দণ্ডবিধির ৩০২, ৩২৬, ৩২৫, ৩৩৭, ৩৩৮, ৪২৭, ৪৬৫, ৪৭১, ২১২, ১১৪, ১০৯, ৩৪ ধারায় বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে এ মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।
ইমারত বিধি না মেনে রানা প্লাজা নির্মাণের অভিযোগে রানাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় অন্য মামলাটি করা হয়, যার তদন্তে ভবনের নকশায় ত্রুটি, অনুমোদন না নিয়ে উপরের দিকে সম্প্রসারণ এবং নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে।
পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ইমারত নির্মাণ আইনের ১২ ধারায় দেয়া এ মামলার অভিযোগপত্রে মোট ১৮ জনকে আসামি করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে রাষ্ট্রপক্ষে ৫৯৪ জন এবং ইমারত আইনের মামলায় ১৩০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
পুনঃ তদন্তে দুদকের মামলা
নকশাবহির্ভূতভাবে রানা প্লাজা নির্মাণের অভিযোগে করা মামলায় দুদক অভিযোগপত্র দিলেও তাতে ত্রুটি থাকায় আদালতের নির্দেশ মামলাটির নতুন করে তদন্ত চলছে।
গত ৬ মার্চ দেয়া আদেশে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক এম আতোয়ার রহমান দুদককে ৮ মের মাধ্যমে আবারও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছে।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে ধ্বসে পড়া রানা প্লাজা নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৫ জুন দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক এস এম মফিদুল ইসলাম সাভার মডেল থানায় এ মামলা করেন।
ভবন মালিক সোহেল রানাকে বাদ দিয়ে ওই মামলায় তার বাবা-মাসহ ১৭ জনকে আসামি করায় ব্যাপক সমালোচনা হয়।
এরপর ২০১৪ সালের ১৬ জুলাই রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা ও দণ্ডবিধি ১০৯ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘রানা প্লাজা’ নামে ছয়তলা একটি শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল নকশা অনুমোদন করে সাভার পৌরসভা। ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি ওই ছয়তলা ভবনের ওপর আরও চার তলা নির্মাণের অনুমোদন চাওয়া হয়।
এরপর আগের অনুমোদনের নথির তথ্য গোপন করে নতুন নথি খুলে পৌর কর্তৃপক্ষ দশ তলা ভবনের নকশা অনুমোদন করে। তাছাড়া রানা প্লাজা নির্মাণের আগে শপিং কমপ্লেক্স করার কথা বলা হলেও পরে সেখানে পাঁচটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি স্থাপনের অনুমতি দেয় সাভার পৌরসভা।
এ মামলার সার্বিক তদারককারী ও দুদকের পরিচালক তাহিদুল ইসলাম দুই বছর আগে প্রতিবেদন দেয়ার সময় রানা প্লাজা নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো রকম নিয়ম-নীতি মানা হয়নি এবং নকশা বহির্ভূতভাবে এই ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনের মালিকের নামের জায়গায় সোহেল রানার বাবা-মায়ের নাম থাকলেও ভবন নির্মাণে প্রভাব খাটানো থেকে শুরু করে আর্থিক অনিয়ম ও যাবতীয় দুর্নীতি সোহেল রানাই করেছেন বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
অভিযোগপত্রের বাকি আসামিরা হলেন- রানার বাবা আব্দুল খালেক, মা মর্জিনা বেগম, সাভার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার হাজি মোহাম্মদ আলী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক (আর্কিটেকচার) এ টি এম মাসুদ রেজা, প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসাইন, সাভার পৌরসভার মেয়র মো. রেফাতউল্লাহ, সাভার পৌরসভার সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাভার পৌরসভার সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম, লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আব্দুল মোত্তালিব, পৌরসভার সাবেক সচিব মর্জিনা খান, সাবেক সচিব মো. আবুল বাশার, ওই ভবনের ভাড়াটে ফ্যান্টম অ্যাপারেলসের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম, নিউ ওয়েভ বটমসের এমডি বজলুস সামাদ এবং ইথার টেক্সের এমডি আনিসুর রহমান।