নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনা করার পুরো ঘটনা ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
বুধবার আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দিয়েছে।
তদন্ত শেষে ৩ নভেম্বর আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে আর ৬ নভেম্বর পরবর্তী আদেশের জন্য বিষয়টি তালিকায় আসবে।
নারায়ণগঞ্জের স্কুলশিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনায় মন্ত্রী থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এ কে এম সেলিম ওসমানের শাস্তি দাবি করলেও পুলিশ তদন্ত করে আদালতকে জানায়, তারা ওই ঘটনায় এ সংসদ সদস্যের কোনো দোষ পায়নি।
নারায়ণগঞ্জের যে বিচারক পুলিশের ওই প্রতিবেদন নথিভুক্ত করে রাখেন, তিনি ‘বিচারিক মন প্রয়োগ করেননি’ বলেও আদেশে উল্লেখ করেছে হাইকোর্ট।
আদালত জানিয়েছে, পুলিশ এই ঘটনায় প্রকৃত দোষীকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে— একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের তদন্তের প্রতিবেদন গ্রহণ করে নথিভুক্ত করার যে আদেশ দিয়েছে এতে আমরা মনে করি ওই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিচারিক মনন (জুডিশিয়াল মাইন্ড) প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এর আগে পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তেজিত জনতার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে ওঠ-বস করানোর ঘটনাটি আকস্মিকভাবে ঘটেছে। শ্যামল কান্তি ভক্ত ও স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান দুইজনই উদ্ভূত পরিস্থিতির শিকার। এতে প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কারোর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ও বন্দর থানার ওসি (তদন্ত) দাখিলকৃত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এ ঘটনায় শ্যামল কান্তি ভক্ত কাউকে দোষী করছেন না। এমন কি আদালত বা পুলিশের কাছে অভিযোগ করবেন না বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। ফলে এ ঘটনায় কারোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায়নি।
শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনায় পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে। পাশাপাশি কী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা জানাতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশের পরই পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে বলা হয় শিক্ষককে কান ধরে ওঠ-বস করানোর ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় পুলিশ জিডি করে। সাধারণ ডায়েরির পরিপ্রেক্ষিতে চলমান তদন্তের অগ্রগতি জানিয়ে প্রতিবেদন দিতে পুলিশ সুপার ও বন্দর থানার ওসিকে আদেশ দেয় হাইকোর্ট। প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর আজ এর ওপর আদেশ দেয়া হলো।
গত ১১ জুলাই নারায়ণগঞ্জে বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত দু’মাস বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তিনি সকাল ৯টায় পুলিশ প্রহরায় বিদ্যালয়ে গিয়ে যোগদান করে দায়িত্ব বুঝে নেন।
এরপর শ্যামল কান্তি ভক্ত ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এ সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানান। যোগদানের সময় তার সঙ্গে ছিলেন বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী হাবীব, থানার ওসি আবুল কালাম, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আ ক ম নুরুল আমিন।
প্রধান শিক্ষকের যোগদানের পর অভিযোগকারী ১০ম শ্রেণীর ছাত্র রিফাতকে নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত দেখিয়ে তার মা স্কুল থেকে নিয়ে যান। রিফাতের মা স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) চেয়েছেন বলে সূত্র জানায়।
প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত জানান, আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। ১৩ মে স্কুলে একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য আমাকে দেড় মাস হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। রমজান ও গ্রীষ্মকালীন ছুটির কারণে দু’মাস পর স্কুলে যোগ দিয়েছি। সংবাদ মাধ্যমের কারণে আমি আমার ন্যায্য অধিকার ফিরে পেয়েছি। তবে আমি এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি না। কারণ পুলিশ পাহারায় আমি যোগদান করতে পেরে নিজেকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি। আমি স্কুলের সব কাজকর্ম আন্তরিকভাবে পালন করব। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই।
উল্লেখ, গত ১৩ মে বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যারয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও ১০ম শ্রেণীর ছাত্র রিফাতকে মারধরের অভিযোগে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান তাকে এলাকাবাসীর সামনে কান ধরে ওঠবোস করান। ঘটনাটি দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।