বোমা ফাটিয়ে এবং ফাঁকা গুলি ছুড়ে রাজধারীর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় ঢুকেছিল জঙ্গিরা। এরপর ‘আল্লাহু আকবার’ শ্লোগান দিয়ে জঙ্গিরা জিম্মি দেশি-বিদেশিদের নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। যাদের হত্যা করা হয় জঙ্গিরা তাদের বলে কাফের।
মোবাইল, ট্যাব ও ল্যাপটপ ব্যবহার করে বাইরের সঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগও করে তারা। ওই হামলায় জিম্মি হওয়া এবং পরে উদ্ধার পাওয়া ভারতীয় নাগরিক সাতপ্রকাশের জবানবন্দিতে ওই দিনের জঙ্গি হামলা ও হত্যাযজ্ঞের এ নারকীয় চিত্র উঠে এসেছে।
গত ২৬ জুলাই ১৬৪ ধারায় আদালতে তার ওই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরায় জঙ্গি হামলায় জিম্মি হয়েও প্রাণে উদ্ধার পেয়ে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ভারতীয় নাগরিক সাতপ্রকাশ। প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে আদালতের কাছে গত ২৬ জুলাই ১৬৪ ধারায় ইংরেজিতে জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি।
জবানবন্দিতে সাতপ্রকাশ বলেছেন, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে ২/৩টি ছেলে ধাক্কাধাক্কি করে হলি আর্টিজানে ঢুকে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপরই আরো ৬/৭ জন রেস্টুরেন্টে দৌঁড়ে আসে। তখনই গুলির শব্দ শুনতে পান সাতপ্রকাশ; সঙ্গে ‘আল্লাহু আকবার’ শ্লোগান।
পিলারের আড়ালে লুকালেও জানালা দিয়ে সাতপ্রকাশ দেখতে পান, মাটিতে পড়ে থাকা কাউকে কোপাচ্ছে জঙ্গিরা।
পরে জঙ্গিরা পাশে থাকা শ্রীলঙ্কান দম্পতির দিকে এগিয়ে গিয়ে লুকাতে নিষেধ করে। পরে সাতপ্রকাশ কাছে মোবাইল চাইলে তা দিয়ে দেয়। বাঙালি কি-না জঙ্গিরা জানতে চাইলে প্রকাশ উত্তর দেয়, ‘ইয়েস, আমি বাঙালি’। এ সময় শ্রীলঙ্কান দম্পতি তাদের ব্যাগ ছুঁড়ে দেয়।
জবানবন্দিতে সাতপ্রকাশ আরো বলেছেন, হামলাকারীরা সবাইকে শুয়ে পড়তে বলে। একজন সাতপ্রকাশকে নিয়ে ভেতরে অন্য বাঙালিদের সঙ্গে বসতে বলে। টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে রাখতে না পারায় এ সময় একজন আঘাতও করে তাকে।
নারীদের মধ্যে একজন ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করলে জঙ্গিরা জবাব দেয়, ‘আমাদের বিবেচনায় আপনারা যদি কাফের না হন, তাহলে আমরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না।’
প্রকাশের কাছে জঙ্গিরা জানতে চেয়েছিল, সে মিডিয়া বা পুলিশের কাউকে চেনে কি-না? প্রকাশ বলেছিল, ‘না’। এ সময় একজন মেয়ে তার মাকে মোবাইল ফোন করে লাউড স্পিকারে বলছিল, দ্রুত বেনজির আঙ্কেল অর্থাৎ র্যা বের মহাপরিচালক বেনজির আহমদেকে ফোন করে আটক থাকার কথা জানাতে।
এরপরই সাতপ্রকাশের সামনে বসা হাসনাত করিমের ফোন বেজে ওঠে। তবে হাসনাতের কথোপোকথন মনে করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন সাতপ্রকাশ।
জঙ্গিরা তাদের পানি ও মাফিন খেতে দেয়, বাথরুম ব্যবহার করতে দেয়। বাংলাদেশিদের হত্যা করবে না এমন আশ্বাস দিয়ে রান্নাঘরে থাকা ২ জনকে বের করার চেষ্টা করে।
পরে দরজা ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে একজন কর্মচারি ও একজন জাপানিকে বের করে আনে। পরে জাপানিকে গুলি করে সাতপ্রকাশকে জিজ্ঞাসা করে জাপানি বেঁচে আছে কি-না? জাপানি নিজেই জবাব দেন ‘হ্যা’। শুনেই আবার গুলি করে তাকে হত্যা করে জঙ্গিরা।
এ সময় শিশুদের চোখ আর নিজেদের কান ঢাকতে বলে তারা। হঠ্যাৎ একজন নারীর গোঙানির শব্দ শুনতে পান সাতপ্রকাশ, দেখতে পান জঙ্গিদের একজন একটি মহিলাকে কোপাচ্ছে এবং বলছে, ‘মহিলা মরতেছে না’।
জঙ্গিরা মোবাইল, ট্যাব ও ল্যাপটপ ব্যবহার করছিল। অনলাইনের খবর পড়ে হাসছিল আর বলছিল, তারা আমাদের সন্ত্রাসী বলছিল, এখন বলছে জঙ্গি। আগামীকাল আমাদের কী বলবে তারা জানেই না!
এ সময় তাদের কর্মকাণ্ডে অভিনন্দন জানিয়ে পাঠানো বাংলায় একটি দীর্ঘ বার্তা পড়ে শোনায় তারা। পুরোপুরি মনে করতে না পারলেও জবানবন্দিতে প্রকাশ বলেছেন, বার্তায় ছিল, তারা খুব বড় কাজ করেছে, এ জন্য তাদের ভাইয়েরা গর্বিত। এরপর তারা সেহরি খায় ও খেতে দেয়।
পরে ভোরের দিকে প্রকাশ দেখেন হাসনাত করিম দরজা খুলছেন। এরপর সবাইকে ছড়িয়ে পড়তে বলে জঙ্গিরা। এ সময় তাহমিদকে পবিত্র কোরআন শরীফ দিতে চাইলে তাহমিদ তা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে প্রাণভয়ে তা নেয় সাতপ্রকাশ। মোবাইল ফোনও ফেরত পায় সে। এরপর রেস্তোরা থেকে বের হয়ে হাঁটা শুরু করে সবাই।
এভাবেই জবানবন্দিতে গুলশান হামলার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন ভারতীয় নাগরিক সাতপ্রকাশ।