মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর বাহিনীর অন্যতম প্রধান ও গণহত্যার হোতা মীর কাসেম আলী যে হত্যাযজ্ঞসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা তার আইনজীবীরাই আদালতে স্বীকার করেছেন।
যুদ্ধপরবর্তী সময়ে শিক্ষা, ব্যবসা, চিকিৎসাসহ নানা ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রেখেছেন উল্লেখ করে মানবতার খাতিরে এ যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কমানোর আবেদন করেন তার আইনজীবীরা।
তদন্তে দেখা গেছে, এ বদর কমান্ডার মূলত পরিচিত জামাতের অর্থের মূল যোগানদাতা হিসেবে। ১৯৭৭ সাল থেকে জামাতের আর্থিক ভিতকে শক্তিশালী করতে কাজ করে গেছেন তিনি। সৌদি আরবসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে শত শত কোটি টাকা এনেছেন।
বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে তা নস্যাৎ করতে অঢেল অর্থ ব্যয় করে দেশি-বিদেশি লবিস্ট নিয়োগও করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে, জামাতের যে ১২৭টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য উঠে এসেছে তার অধিকাংশেরই নিয়ন্ত্রক মীর কাশেম।
এছাড়াও বিচার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্যাসিডি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ নামে একটি ল’ ফার্মের সঙ্গে প্রায় পৌনে ৩০০ কোটি টাকার চুক্তির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ সব অর্থের তথ্য জানতে এরইমধ্যে মার্কিন প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এদিকে, আপিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানি চলার সময় এ বদর কমাণ্ডারের আইনজীবী দেশের অর্থনীতিতে মীর কাসেমের ভূমিকা বিবেচনা করা শাস্তি কমানোর আবেদন করলেও এর বিরোধিতা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
মীর কাসেমের উত্থান:
১৯৫২ সালে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে জন্ম নেয়া মীর কাশেম আলীর বাবা ছিলেন চট্টগ্রামের টেলিগ্রাফ অফিসের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারি। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা মীর কাশেম একাত্তরে ছিলেন জেলা ছাত্র সংঘের সভাপতি।
পরে আলবদর বাহিনী গঠন করে সেখানে গণহত্যা, নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের নেতৃত্ব দেন।
মুক্তিযুদ্ধের পরে দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকলেও ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসিত করলে জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন মীর কাশেম।
এ সময় হাজার হাজার মুসলমান শহীদ হয়েছে, মসজিদ মাদ্রাসা ভেঙে ফেলা হয়েছে এমন মিথ্যা তথ্য দিয়ে ইসলামি এনজিওর মাধ্যমে সৌদি সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সেই থেকেই শুরু হয় মীর কাশেমের উত্থান পর্ব— যার মূল লক্ষ্য ছিল জামাতকে শক্ত অর্থনৈতিক ভিতের ওপর দাঁড় করানো।
১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ শুরু করেন তিনি।
এরপর চিকিৎসাসেবা, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ, গণমাধ্যম ও শিক্ষাসহ এমন কোনো খাত নেই যেখানে মীর কাশেম তার প্রভাব বিস্তার করেননি।