নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুন হত্যায় মামলা প্রধান আসামি নূর হোসেন, র্যাব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও মাসুদ রানাসহ ২৬ আসামিকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত।
সোমবার জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন। বাকি ৯ জনকে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে আদালত।
এ মামলার ৩৫ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ২৩ জনকে আজ আদালতে হাজির করা হয়। তাদের মধ্যে ১৭ জন র্যা বের সদস্য। মামলার শুরু থেকেই র্যা বের সাবেক ৮ সদস্যসহ ১২ আসামি পলাতক রয়েছে।
এ মামলায় ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়, তারা হলো: চাকরিচ্যুত লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা, হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দ বালা, করপোরাল রুহুল আমিন, এএসআই বজলুর রহমান, হাবিলদার নাসির উদ্দিন, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, সৈনিক নুরুজ্জামান, কনস্টেবল বাবুল হাসান ও সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর।
কারাগারে থাকা বাকি আসামিরা হল: সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, তার সহযোগী আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দীপু, রহম আলী, আবুল বাশার ও মোর্তুজা জামান (চার্চিল)।
পলাতক আসামিরা হল: করপোরাল মোখলেছুর রহমান, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবীর, এএসআই কামাল হোসেন, কনস্টেবল হাবিবুর রহমান এবং নূর হোসেনের সহযোগী সেলিম, সানাউল্লাহ ছানা, ম্যানেজার শাহজাহান ও ম্যানেজার জামাল উদ্দিন।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলার তদন্তকারী সংস্থা মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন ও র্যা বের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করলে গ্রেপ্তারকৃত ২৩ আসামির উপস্থিতিতে যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করে।
দীর্ঘ দুই বছর ধরে শুনানি শেষে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে এ মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন, র্যা ব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও মাসুদ রানাসহ ২৩ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত প্রাঙ্গনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
সর্বোচ্চ শাস্তির রায় ঘোষণার পর নিহতের স্বজন ও রাষ্ট্রপক্ষ এবং বাদীপক্ষের আইনজীবীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন রায় ঘোষণার সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন নারায়ণগঞ্জবাসী আজ কলঙ্কমুক্ত হলো।
প্রসঙ্গত: ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া শান্তিনগর এলাকায় মরদেহ ভেসে উঠলে অপহৃত ওই সাত জনের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে জনতা, সুশীলসমাজ ও আইনজীবীরা। তারা দফায় দফায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। ওই ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন।
বিজয় পাল বলেন, আমরা আমাদের স্বজনদের হারিয়েছি— যে কোনো হত্যাকাণ্ডেরই শাস্তি হওয়া উচিত, যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি- মৃত্যুদণ্ড হোক।
তিনি আরো বলেন, আদালত এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে যেন কেউ আর এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর চিন্তাও করতে না পারে।
নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, আমরা আদালতের কাছে প্রত্যাশা করছি, আসামিদের যেন সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ নুর হোসেনের পরিকল্পনায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে র্যা বের তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, লে. কমান্ডার এম. এম. রানা, মেজর আরিফসহ এ হত্যা মামলায় জড়িতরা এ হত্যাকাণ্ড করে। এ ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে র্যা বের সাবেক তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী একে একে ২৩ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এ ঘটনায় তৎকালীন ডিসি-এসপিসহ দুই শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়।
অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, আদালতে এই মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ ও যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়েছে। ওই সময় আদালতে আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী কাজ করেন নি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আদালতে ৭ খুন বিষয়ে প্রয়োজনীয় সাক্ষী ও প্রমাণ দাখিল করা হয়েছে।