সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলা মামলার আসামি মুফতি হান্নানকে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়েছে।
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেলসুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গির মৃত্যু পরোয়ানা শুক্রবার কারাগারে পৌঁছানোর পর তা পড়ে শোনানো হয়েছে।
সব আইনি প্রক্রিয়াগুলো শেষে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে বলে জানান তিনি।
হান্নান ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই জন হলেন:- শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল ও দেলোয়ার ওরফে রিপন।
জানা গেছে, মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া এ আসামি ইতোমধ্যে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন (রিভিউ) করবেন।
গত বছরের ৭ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গির আপিল শুনানির পর তা খারিজ করে।
আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্ট হয়ে নিম্ন আদালতে যাওয়ার পর বিচারিক আদালত মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে এবং তা গত শুক্রবার গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছায়।
মুফতি হান্নান আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আপিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন। তাতে রায় না বদলালে ফাঁসির দঁড়ি এড়াতে তার সামনে কেবল দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ থাকবে।
তিনি সেই সুযোগ না নিলে অথবা আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে কারাবিধি অনুযায়ী এ জঙ্গিনেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে আর বাধা থাকে না।
এর আগে ৩০ নভেম্বর এ মামলায় আপিল শুনানি শুরু হয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামি আপিল না করায় তাদের আগের রায়ই বহাল রয়েছে।
উল্লেখ, ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটের হজরত শাহজালালের (র.) মাজারে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা হয়।
ওই হামলায় আনোয়ার চৌধুরী, সিলেট জেলা প্রশাসকসহ প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন এবং পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ তিনজন নিহত হন।
মামলার বিচার শেষে ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিচারিক আদালত আসামিদের মধ্যে মুফতি হান্নান, বিপুল ও রিপনকে মৃত্যুদণ্ড এবং মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
নিয়মানুসারে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করতে প্রয়োজনীয় নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পাশাপাশি ২০০৯ সালে আসামিরা জেল আপিলও করেন।
মামলা নিয়ে কিছু কথা:
সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে ২০০৪ সালের ২১ মে ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী গ্রেনেড হামলার শিকার হন।
এতে ঘটনাস্থলেই পুলিশের এএসআই কামাল উদ্দিন নিহত হন এছাড়া পুলিশ কনস্টেবল রুবেল আহমেদ ও হাবিল মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি মারা যান হাসপাতালে। আনোয়ার চৌধুরী ও সিলেটের জেলা প্রশাসকসহ কমপক্ষে ৪০ জন আহত হন।
পুলিশ ওইদিনই সিলেট কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করে। তদন্ত শেষে ২০০৭ সালের ৭ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, তার ভাই মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল ও দেলোয়ার ওরফে রিপনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়।
যথাযথ ঠিকানা না থাকায় মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ ওরফে খাজার নাম প্রথমে বাদ দেয়া হলেও পরে তাকে যুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ওই বছর নভেম্বরে হয় অভিযোগ গঠন।
৫৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামীম মো. আফজাল রায় ঘোষণা করেন।
আসামিদের মধ্যে মুফতি হান্নান, বিপুল ও রিপনকে মৃত্যুদণ্ড এবং মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের (মুত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন) শুনানি শেষে গত বছর ১১ ফেব্রুয়ারি রায় দেয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ।
তাতে আসামিদের আপিল খারিজ হয়ে যায়, মুফতি হান্নানসহ তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং দুইজনের যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল থাকে, ওই রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন হান্নান ও বিপুল। আর দেলোয়ারের পক্ষে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়।
গত বছরের ৭ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়েও ওই তিন আসামির সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখে।