ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দুই শিশু জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা তাদের জাপানি মা নাকানো এরিকোর কাছে থাকবে। আজ এই রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে দুই জাপানি শিশুর জিম্মার ব্যাপারে বিরোধকে কেন্দ্র করে করা মামলাটি ৩ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
এর আগে হাইকোর্ট বলেছিলেন বাবার কাছে থাকবে মেয়েরা। হাইকোর্টের সেই রায় বাতিল করে রবিবার প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ৫ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ নতুন এই আদেশ দেন।
আদেশে আরও বলা হয়, এই সময়ে নাকানো এরিকো শিশুদের নিয়ে দেশত্যাগ করতে পারবেন না। বাবা ইমরান শরীফ সুবিধাজনক সময়ে শিশুদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।
আদালতে নাকানো এরিকোর পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম ও মোহাম্মদ শিশির মনির। ইমরান শরীফের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ফিদা এম কামাল ও ফাওজিয়া করিম ফিরোজ।
আইনজীবী শিশির মনিরের তথ্যমতে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ইমরান শরীফের সঙ্গে ২০০৮ সালের জুলাইয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো। জাপানি আইনানুসারে বিয়ে হয় তাদের। বিয়ের পর তারা টোকিওতে শুরু করেন বসবাস। ১২ বছরের সংসারে তিনটি কন্যাসন্তান হয় তাদের।
তারা হলো- জেসমিন মালিকা, লাইলা লিনা ও সাত বছরের সানিয়া হেনা। এরিকো পেশায় একজন চিকিৎসক। তিন মেয়ে টোকিওর চফো সিটিতে অবস্থিত আমেরিকান স্কুল ইন জাপানের (এএসজেআই) শিক্ষার্থী ছিল।
সমস্যা বাধে ২০২১ সালে। ঐ বছরের ১৮ জানুয়ারি শরীফ ইমরানের সঙ্গে এরিকোর বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ২১ জানুয়ারি ইমরান আমেরিকান স্কুল ইন জাপান কর্তৃপক্ষের কাছে তার মেয়ে জেসমিন মালিকাকে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেন। এতে এরিকোর সম্মতি না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ ইমরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরপর একদিন জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা স্কুলবাসে বাড়ি ফেরার পথে বাসস্ট্যান্ড থেকে ইমরান তাদের অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান।
ওই বছরের ২৫ জানুয়ারি ইমরান তার আইনজীবীর মাধ্যমে এরিকোর কাছ থেকে মেয়েদের পাসপোর্ট হস্তান্তরের আবেদন করেন। কিন্তু এরিকো ওই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে মেয়েদের নিজ জিম্মায় পেতে আদেশ চেয়ে একই বছরের ২৮ জানুয়ারি টোকিওর পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। আদালত ৭, ১১ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি মেয়েদের সঙ্গে এরিকোর সাক্ষাতের অনুমতি দিয়ে আদেশ দেন।
কিন্তু ইমরান আদালতের আদেশ ভঙ্গ করে মাত্র একবার মায়ের সঙ্গে দুই মেয়েকে সাক্ষাতের সুযোগ দেন। এরপর ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ‘মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে’ ইমরান তার মেয়েদের জন্য নতুন পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে নিয়ে তিনি দুবাই হয়ে বাংলাদেশে আসেন।
এরপর একই বছরের ৩১ মে টোকিওর পারিবারিক আদালত জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে তাদের মা এরিকোর জিম্মায় হস্তান্তরের আদেশ দেন। তবে দুই মেয়ে বাংলাদেশে থাকায় বিষয়টি নিয়ে তিনি বাংলাদেশের একজন মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। গত বছরের ১৮ জুলাই তিনি শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে আসেন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ইমরান শরীফের সঙ্গে ২০০৮ সালের জুলাইয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো।
গতবছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ইমরান শরীফ সন্তানদের জন্য নতুন পাসপোর্টের আবেদন করেন। আবেদন মঞ্জুর হলে ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন পাসপোর্ট পেয়ে বড় দুই মেয়েকে নিয়ে চারদিন পর বাংলাদেশে চলে আসেন শরীফ।
ওই বছরের ৩১ মে টোকিওর পারিবারিক আদালত এক আদেশে দুই মেয়েকে নাকানো এরিকোর জিম্মায় হস্তান্তরের আদেশ দেয়। এরপর গত ১৮ জুলাই নাকানো এরিকো বাংলাদেশে এসে মেয়েদের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ইমরান শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হন। এরপরই হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন নাকানো এরিকো। শুরু হয় তাদের মাঝে আইনী লড়াই।