প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে যুগাবতার শ্রীকৃষ্ণ মথুরার রাজা কংসের কারাগারে আত্মমায়ায় মা দেবকীর অষ্টম গর্ভে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে আবির্ভূত হন।
তার আবির্ভাব সম্পর্কে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় তিনি নিজেই বলেছেন : পৃথিবীতে যখনই ধর্মের গ্লানি হয় এবং অধর্মের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখনই আমি আত্মমায়ায় (নিজে নিজে) শরীর ধারণ করে নিজেকে প্রকাশ করি। যুগে যুগে আমি সাধুদের পরিত্রাণ, দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করি এবং ধর্ম সংস্থাপনের নিমিত্ত আবির্ভূত হই।
জ্ঞানেশ্বরীতে জ্ঞানদেব লিখেছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অবতারের তত্ত্ব সম্পর্কে বোঝাতে গিয়ে জানিয়েছেন: হে কিরীটি, আমি স্বয়ং নিরাকার, পরন্তু যখন প্রকৃতির আশ্রয় গ্রহণ করি, তখন (জগতের) কার্যের জন্য আকার ধারণ করিয়া নটের ন্যায় ব্যবহার করি। কারণ আদিকাল হতে এই স্বাভাবিক ক্রম (রীতি) চলিয়া আসিতেছে যে, যুগে যুগে আমাকে সমস্ত ধর্ম (ধর্মের ব্যবস্থা) রক্ষা করিতে হবে।
সেই জন্যই যখন অধর্ম ধর্মকে অভিভূত করে, তখন আমি আমার অজত্ব দূরে সরাইয়া রাখি এবং নিরাকারত্ব ভুলিয়া যাই। তখন আমার ভক্তগণের রক্ষার্থে (পক্ষ লইয়া) আমি সাকার হইয়া অবতীর্ণ হই এবং অজ্ঞানরূপ অন্ধকারকে গ্রাস করি।
অধর্মের সীমা ভাঙ্গিয়া ফেলি (সমূলে নাশ করি), পাপের লেখা মুছিয়া ফেলি (পাপ নিশ্চিহ্ন করি), সজ্জন লোকের হস্তে সুখের ধ্বজা উড়া, দৈত্যকুলের নাশ, সাধুগণের মান প্রতিষ্ঠা করি, ধর্ম ও নীতির মধ্যে গাঁটছড়া বাঁধিয়া তাহাদের ওপর অক্ষত ছড়াই (লাজ বর্ষণ করি), অজ্ঞানের অন্ধকার (কাজল) নাশ করিয়া বিবেকের দীপ জ্বালি, তখন যোগিগণ নিরন্তর দীপাবলির আলোক উপভোগ করেন।
আত্মসুখে বিশ্ব ভরিয়া যায়, জগতে ধর্মের প্রতিষ্ঠা হয়, ভক্তগণ সাত্তি্বকভাবে পরিপূর্ণ হইয়া স্ফীতোদর হন।জ্ঞানদেব বিরচিত ‘জ্ঞানেশ্বরী’ অনূদিত_ গিরীশ চন্দ্র সেনপ্রাসঙ্গিক আলোচনায় শ্রীকৃষ্ণ দাস কবিরাজ অবতার সম্পর্কে শ্রী চৈতন্যচরিতামৃতে আবারও বলেছেন: ‘আপনারে করিমু ভক্তভাব অঙ্গীকার, আপনি আচরি ধর্ম শিখাইনু সবারে, আপনে না কৈলে ধর্ম শিখান না যায়, এইত সিদ্ধান্ত গীতা ভাগবতে গায়।’
প্রকৃতি জগতে অবতারের উদ্দেশ্য জনকল্যাণ, অপ্রাকৃত জগতে আত্মমুক্তি বিন্দুতে সিন্ধুর মিলন। যুগাবতার শ্রীকৃষ্ণ জীবন চরিত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা পাই তিনি একজন উত্তম শিক্ষক, বিচক্ষণ রাজনীতিক, শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক এবং সদগুরু।
তিনি তার সারাজীবন আচার-আচরণ এবং কর্মের দ্বারা জীব-জগৎকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। শিশুকালে ব্রজের গোপাল ধরে বাৎসল্যপ্রেমে ব্রজবাসীকে মুগ্ধ করেছেন বাঁশরি বাজিয়ে ভক্তিরসে আপ্লুত করেছেন। কোমলতা ও মধুরতার প্রতীক হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। আবার কঠোর হয়ে পুতনা, অঘাসুর, বকাসুর বধ করে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন করেছেন।
যৌবনে পার্থ সারথি হয়ে শ্রীকৃষ্ণ রূপে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। সংগ্রাম করেছেন। প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। দুর্নীতিপরায়ণ, অত্যাচারী ও অন্যায়কারীর হাত থেকে নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, শোষিত মানুষকে রক্ষা করে নীতিবাদী, আদর্শবাদী ও ধার্মিক ব্যক্তিদের সংঘবদ্ধ করেছেন। কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল ও দুর্যোধনদের ধ্বংস করে ধর্মরাজ্য স্থাপন করেছেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে সিংহাসনে বসিয়েছেন।
গীতা ধর্ম প্রচার করে মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির বিধান করে ব্যক্তিজীবন থেকে সাময়িক ও সমাজ জীবনের প্রতিটি স্তরে উৎসারিত করেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘আত্মমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’_ ব্যষ্টি জীবনে আত্মমোক্ষ বা অন্তর্জগতে মানবাত্মার উন্নতি, বাহ্যিক জগতে মানবসমাজে কল্যাণ সাধন, তাদের নৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি স্তরে উন্নতি বিধান করা তার আবির্ভাবের উদ্দেশ্য।
তাই শ্রী জন্মাষ্টমী তিথি উদযাপনের মধ্য দিয়ে প্রতিটি হিন্দু শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষার প্রতি দৃঢ় আস্থা জ্ঞাপন করে কর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। বিশ্ব ভ্রাতৃত্বে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীব কল্যাণে ব্রতী হয়। এই আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে পরম শান্তি লাভ করে।