বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত। লেখাপড়ার অতিরিক্ত চাপ ও ইন্টারনেটে আসক্তি-সর্বোপরি মুক্ত পরিবেশের অভাব মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে শিক্ষার্থীদের।
পাঁচজন বিশেষজ্ঞের করা একটি জরিপ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সহায়ক পরিবেশ না থাকায় শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ সন্ত্রাসী তৎপরতার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে দৃঢ় পারিবারিক বন্ধনের অভাব, মানসিক বিকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা এবং কিছু বিপথগামী শিক্ষকের কারণেই এখানকার শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদের ভয়াবহ ফাঁদে পা বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একটি জরিপ চালিয়েছেন আইসিডিডিআরবির গবেষণা কর্মকর্তা আতিয়া আরেফিন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক কবিরুল বাশার, আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ফারাহ পারিশা ভূঁইয়া, ইবনে সিনা হাসপাতালের সাইকোথেরাপিস্ট মাসুদা খানম তিথি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল শিক্ষার্থী মনোয়ারুল হক।
বিশ্ববিদ্যালয়টির চারটি বিভাগের ৪০০ শিক্ষার্থীর ওপর এই জরিপ চালানো হয়। জরিপে উঠে আসে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৭৫ ভাগই কোনো না কোনোভাবে মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত।
ইন্টারনেটে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তিও এর পেছনে বড় একটি কারণ বলে জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অপ্রয়োজনীয় চাপ নিয়ে আলাদা একটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেন এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক ফয়সল চৌধুরী।
এতে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত ক্লাস-পরীক্ষা, কর্তৃপক্ষের দ্বৈতনীতি, মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে এমন পরিবেশ শিক্ষার্থীদের হতাশাগ্রস্ত করে তোলে।
দেশে বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলার ঘটনায় নর্থ সাউথের কয়েকজন শিক্ষার্থী জড়িত থাকায় এই বিষয়গুলো সামনে উঠে এসেছে। তবে শুধুমাত্র ইন্টারনেট আসক্তি বা পড়াশোনার চাপ শিক্ষার্থীদের হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে- এ বিষয়ে দ্বিমত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম। তার মতে, এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিষাদগ্রস্ত, পরিবারিক পরিবেশের কারণেই।
আর মানসিক বিষাদগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের কারো কারো জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার পেছনে কিছু শিক্ষকও জড়িত থাকতে পারে বলেও ধারণা করছেন তিনি। তাই এসব ঘটনার পৃষ্ঠপোষকদের দ্রুত খুঁজে বের করার পরামর্শ তার।
এসব বিষয়ের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ না থাকা, সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব ও মানসিক অবসাদও জঙ্গিবাদের পেছনে বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি।
গুলশান এবং শোলাকিয়ায় হামলা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জড়িত থাকার পর এ বিষয়টি নজরে আসে সবার।
প্রসঙ্গত, ১ জুলাই (শুক্রবার) রাত পৌনে ৯টার দিকে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হত্যাযজ্ঞ চালায় জঙ্গিরা। ১২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর জিম্মি সংকটের রক্তাক্ত অবসান ঘটে শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সেনা নেতৃত্বাধীন সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে। অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যাদের জঙ্গিরা আগেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করেছিল।
এ ২০ জনের মধ্যে ১৭ জন বিদেশি নাগরিক ও ৩ জন বাংলাদেশি। উদ্ধার অভিযানে নিহত হয় আরও ছয় জন। এর আগে শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রথম দফা উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। আহত হন কমপক্ষে ৪০ জন। এদিকে, ঈদের দিন শোলাকিয়ায় হামলায় দুই পুলিশ সদস্য এক নারী ও এক হামলাকারী নিহত হয়েছে।