মানববন্ধন, সমাবেশ ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ‘কালো দিবস’ পালিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কালো দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার সকালে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এ আয়োজনে ছাত্র-শিক্ষকরা।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায় সরকারের সময় ছাত্র-শিক্ষকদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়ে বলা হয়, ১/১১ সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনায় নেপথ্যের কুশীলবদের জড়িতদের শাস্তি দেয়ার।
এছাড়াও সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিও উঠে ছাত্র-শিক্ষকদের এ আয়োজনে।
এ সময় বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ওই ঘটনার পর নবম জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তদন্ত করে দেয়া সুপারিশের বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এছাড়া, ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শোক দিবসের আলোচনায় অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন এতোদিনেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত কারোর শাস্তি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য আআমস আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।
ফিরে দেখা ওই সময়ের কথা:
মামলার খড়গ নেই মাথায় ওপর নেই আইনি জটিলতাও— ২০০৭ সালের ২০-২৩ আগস্ট সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সংঘাত-সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার-নির্যাতনের পর মামলা থেকে রেহাই মিলেছে ছাত্র-শিক্ষকদের।
তবু ভূক্তভোগিদের আক্ষেপ- আজও বিচারের আওতায় আনা যায়নি ঘটনার নেপথ্য কুশীলবদের। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি।
দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি নির্যাতিতদের।
প্রসঙ্গত, ঘটনার সূত্রপাত ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট— পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে স্থাপিত হয়েছিল সেনা ক্যাম্প। ওই মাঠে ফুটবল খেলা দেখা নিয়ে তুচ্ছ ঘটনার জেরে কথা কাটাকাটি হয় ছাত্রদের সঙ্গে সেনা সদস্যদের।
বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে ঘটে মারধরের ঘটনা। এই প্রেক্ষাপটে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা ক্যাম্পাস। রাস্তায় নেমে আসেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
জরুরি অবস্থার মধ্যে বিক্ষোভ প্রতিরোধে নামানো হয় সেনাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নির্যাতনের শিকার হন ছাত্র-শিক্ষক সবাই। গ্রেপ্তার করা হয় বেশ কয়েকজন শিক্ষকসহ সাধারণ ছাত্রদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে উত্তাল বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। সেসব জায়গায়ও চলে নিরাপত্তা বাহিনীর অ্যাকশন।
ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ শিক্ষক এবং সারাদেশে প্রায় ৮০ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর বিরুদ্ধে মামলা হয় ৬৮টি। তীব্র আন্দোলনের মুখে কয়েকমাস পর মুক্তি পান শিক্ষক-ছাত্ররা। রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপে পরে সাজা মওকুফ এবং মামলাও প্রত্যাহার হয়।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিদায়ের পর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ওই ঘটনা এবং ছাত্র-শিক্ষক নির্যাতনের কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করে ২০১০ সালে।
কমিটি সেসময়ের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমেদ, সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ও আমলাকে দায়ী করে বেশ কিছু সুপারিশ করে। তবে সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি আজও।
এ নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে নির্যাতিত ও কারাবরণকারী ছাত্র-শিক্ষক সবার।
যদিও সন্তুষ্টির বিষয় যে কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে আর রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপে সাজা মওকুফ এবং মামলা প্রত্যাহারের পর এখন আর আইনি কোনো ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না কাউকে।
তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ এবং মামলা প্রত্যাহার হলেও বাস্তবায়িত হয়নি সেই সময়ে উঠে আসা দাবির।
ছাত্র-শিক্ষক নির্যাতনের নির্দেশদাতাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি যেমন রয়েছে তেমনি দিন দিন জোড়ালো হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতের।
সবার প্রত্যাশা যে সরকার তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসুক কাজ করুক আন্তরিকতা নিয়ে।