বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘অনিয়ম ও কারচুপির’ অভিযোগ তুলে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরওয়ার।
সোমবার বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা বলেন তিনি।
সকাল ৮টায় এ সিটির ১২৩টি কেন্দ্রে ভোট শুরুর চার ঘণ্টার মাথায় করে তিনি এ ঘোষণা দেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ৭০-৮০টি কেন্দ্রে তার পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি বাকি যেসব কেন্দ্রে এজেন্টরা ঢুকতে পেরেছেন, তারাও ‘নৌকা মার্কায় সিল মারতে দেখেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে— এভাবে চলতে পারে না। নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছি যেন এই নির্বাচন স্থগিত করে। কিন্তু তারা আমাদের কথায় গুরুত্ব দেয়নি বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, তাই নির্বাচন কমিশনের প্রতি নিন্দা। এই নির্বাচন আমরা প্রত্যাখ্যান ও বর্জন করলাম।
এর আগে সকালে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরওয়ার তার এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ করেছেন।
সোমবার সকাল ৮টা থেকে প্রায় আড়াই লাখ ভোটারের এ নগরীর ১২৩টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে।
সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে মজিদুন্নেসা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নিজের ভোট দিতে যান বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার।
এ সময় তার সঙ্গে বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী ছিলেন— তারাও কেন্দ্রে প্রবেশ করেন।
তিনি বুথে প্রবেশ করে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে বলেন, তিনি তার ভোটার নম্বর জানেন না।
প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বলেন, ভোটার নম্বর ছাড়া ভোট দেয়ার সুযোগ নেই— নম্বর এখন খুঁজে বের করা যাবে না।
পরে সরওয়ারের সঙ্গে থাকা লোকেরা বাইরে গিয়ে ভোটার নম্বর নিয়ে আসেন। এতে দেখা যায়, কেন্দ্রের যে বুথে মজিবর রহমান সরওয়ার ভোট দিতে গিয়েছিলেন, ওই বুথের ভোটার তিনি নন। পরে কেন্দ্রের যে বুথের ভোটার, সেখানে গিয়ে সোয়া ১০টার দিকে গিয়ে ভোট দেন তিনি।
এ সময় মজিবর রহমান সরওয়ার অপেক্ষা করতে থাকেন তার ভোটার নম্বরের কার্ড আসার জন্য। কিন্তু বাইরে হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। নৌকা প্রতীকের ব্যাজধারী অনেকেই ‘জয় বাংলা’, ‘সরওয়ারকে বাইর কর—স্লোগান দিতে থাকেন। ২০-২৫ জন ভোটকেন্দ্রে ঢোকার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বাক্যবিনিময় শুরু হয়। এ সময় মজিবর রহমান সরওয়ার কেন্দ্রে আটকা পড়েন। বাইরে আরও লোক জড়ো হয়। অতিরিক্ত পুলিশ এসে বিএনপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরওয়ারকে বের করেন।
বাইরে বেরোলে অপেক্ষারত নৌকা প্রতীকের ব্যাজধারী লোকজন মজিবর রহমান ও বিএনপির নেতাকর্মীদের ঘিরে ধরেন। তার সঙ্গে থাকা লোকজন আওয়াজ তুলে সরওয়ারকে বের করার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ সদস্যরা মজিবর রহমান সরওয়াকে গাড়িতে তুলে কেন্দ্র থেকে বের করে দেন।
ভোটার নম্বর না থাকায় কয়েকটি বুথ ঘুরে শেষ পর্যন্ত ৬ নম্বর বুথে নিজের ভোট দেন সরওয়ার।
বেরিয়ে এসে তিনি সাংবাদিকদের সামনে অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে তার এজেন্টদের বের করে দেয়া হচ্ছে।
প্রায় ৫০টি কেন্দ্রে এই অবস্থা বিরাজ করছে। ৩০ নম্বর সেন্টারে কোনো এজেন্টেকে ঢুকতেই দেয়া হয়নি। পুলিশ এজেন্টদের বের করে দিচ্ছে। এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। কোনো সেন্টারে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না এজেন্টদের।
সরওয়ার বলেন, এটা কেয়ামতের মত ঘটনা— এজেন্টরা হাহাকার করছে। মানুষ কার কাছে সিকিউরিটি চাইবে? কে তাদের নিরাপত্তা দেবে? প্রশাসন পুলিশই তাদের ঢুকতে দিচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে ভোট নিয়ে পরে ‘সিদ্ধান্ত জানাবেন’ বলে কেন্দ্র ছাড়েন বিএনপি প্রার্থী।
সাদিক, সরওয়ারসহ মোট সাত জন প্রার্থী বরিশালের মেয়র হওয়ার জন্য এবার ভোটের লড়ছেন। তাদের মধ্যে থেকে একজনকে মেয়র হিসেবে বেছে নেয়ার পাশাপাশি সাধারণ ওয়ার্ডে ৩০ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ১০ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত করছেন ভোটাররা।
এর আগে সকালে কেন্দ্রে গিয়ে মজিবর রহমান সরওয়ার সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, অর্ধশতাধিক কেন্দ্র থেকে তার পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কোনোভাবেই সুষ্ঠু ভোট হবে না।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানা গেছে, গত ১৩ জুন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়। ১০ জুলাই প্রতীক বরাদ্দের পর টানা ১৯ দিন প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ১৩২ জন প্রার্থী। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী গত শুক্রবার রাত ১২টায় সব ধরনের প্রচারণা বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নানা প্রতিশ্রুতি ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় প্রচার-প্রচারণার পর্ব।
হালনাগাদ ভোটার তালিকা অনুযায়ী এবার সিটি করপোরেশন এলাকায় ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪২ হাজার ১৬৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২১ হাজার ৪৩৬ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ২০ হাজার ৭৩০ জন। এই সিটি করপোরেশনের চতুর্থ নির্বাচনে মেয়র পদে ৬ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৯৪ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ১২৩টি এবং ভোটকক্ষের সংখ্যা ৭৫০টি। এর মধ্যে ১১টি কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হবে। আজকের নির্বাচনে ২০৩ জন স্থানীয় ও তিনজন বিদেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। নির্বাচন উপলক্ষে সিটি করপোরেশন এলাকার সব অফিস-আদালতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
১২৩টি ভোটকেন্দ্রের ১১২টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নগর পুলিশ।