রাজধানীর কাওরান বাজারে দুই বাসের চাপায় হাত হারানো তিতুমীর কলেজের স্নাতক বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস বলেন,
হাত বিচ্ছিন্ন ও মস্তিষ্কের আঘাতেই রাজীবের মৃত্যু হয়েছে।
প্রদীপ বিশ্বাস আরো বলেন, আমি এবং কয়েকজন চিকিৎসক মিলে রাজীবের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছি— হাত বিচ্ছিন্ন ও মস্তিষ্কের আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে।
রাজীবের মামা জাহিদুল ইসলাম জানান, হাসপাতালের সব প্রক্রিয়া শেষে নামাজে জানাজার জন্য হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে নেয়া হবে রাজীবের মরদেহ। সেখানে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জানাজা শেষে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাঁশবাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন করা হবে।
এসময় ঢামেক হাসপাতালে রাজীবের দুই ছোট ভাই মেহেদি হাসান ও আব্দুল্লাহসহ আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক ডা. রেজার বলেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১২টা ৪০ মিনিটে রাজীব হোসেন মৃত্যুবরণ করেন।
রাজীব হোসেনের মরদেহ পটুয়াখালীতে তার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে।
দুর্ঘটনার পর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে একবার রাজীব বলেছিলেন, ‘রাজীব কে? রাজীব মারা গেছে!’
রাজীবের মামা মো. জাহিদ বলেন, গতকাল সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাজীব মারা গেছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) বাচ্চু মিয়া রাতেই বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এর আগে গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাজীবের চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শামসুজ্জামান জানান, ভোর ৪টার দিকে আইসিইউতে রাজীবের শ্বাসকষ্ট শুরু হয় সেই সঙ্গে তার ‘কনশাসনেস’ কিছুটা কমে আসে। হেড ইনজুরির ক্ষেত্রে এরকম হয়।
ওই ঘটনায় রাজীবের মাথার সামনে ও পেছনের হাড় ভেঙে যায় ব্রেইনের সামনের দিকেও সে আঘাত পায়—জানান তিনি।
গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের বর্ষের ছাত্র রাজীব বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারান। দুই বাসের চাপায় তার ডান কনুইয়ের ওপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
দুর্ঘটনার পর রাজীবকে প্রথমে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে পরে সেখান থেকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তার চিকিৎসার জন্য গঠন করা হয় মেডিকেল বোর্ড।
গত ৬ এপ্রিল বোর্ড প্রধান জানান, রাজীবের মাথায় আপাতত সার্জারি লাগবে না— তবে হাতের আঘাতের জায়গায় আরও কয়েকটা সার্জারি করতে হবে।
রাজীব হোসেনের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ সরকার বহন করবে বলে ঘোষণা দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। সুস্থ হলে তাকে সরকারি চাকরি দেয়ার আশ্বাসও দেন মন্ত্রী। সেটা আর তার জীবনে দরকার হচ্ছে না, কারণ না ফেরার দেশে নিজের নাম লিখে নিয়েছে রাজীব।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামের রাজীব তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মা এবং অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান। পরে ঢাকার মতিঝিলে খালার বাসায় থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। তিতুমীর কলেজে স্নাতকে ভর্তি হওয়ার পর যাত্রাবাড়ীতে একটি মেসে ভাড়া থেকে পড়াশোনা করতেন রাজীব। পাশাপাশি একটি কম্পিউটারের দোকানেও কাজ করতেন তিনি। নিজের পাশাপাশি ছোট দুই ভাইয়ের খরচও চালাতে হতো তাকে।
উল্লেখ্য, গত ৩ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারার সামনে দুই বাসের চাপায় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে ৪ এপ্রিল বিকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজীবকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়।