বাংলাদেশে গত তিন মাসে তিন জন ব্লগার হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ লেখক সালমান রুশদি, নরওয়ের ইয়স্তেন গার্ডার এবং কানাডার মার্গারেট অ্যাটউডসহ বিভিন্ন দেশের ১৭৮ জন লেখক।
ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে সই করেছেন তারা। লেখকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন 'পেন' বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এ চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
খোলা চিঠিতে ওই ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ওই চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে আরও রয়েছেন ম্যান-বুকার বিজয়ী লেখক ইয়ান মার্টেল, আইরিশ লেখক কোলম টবিন, ভারতীয় লেখক অমিতাভ ঘোষ এবং পেন ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট জন র্যা লস্টন সাউলসহ আরো বিভিন্ন দেশের লেখকেরা।
এতে বলা হয়েছে, গত ১২মে সিলেটে ৩২ বছর বয়সী ব্লগার ও লেখক অনন্ত বিজয় দাস খুন হন। নিজের বাসা থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে মুখোশধারী চার হামলাকারী তাকে ধাওয়া করে এবং চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।
খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডের আগে তিনি কয়েকবার ইসলামি উগ্রবাদীদের হুমকি পেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের ইসলামবিরোধী ও ধর্ম অবমাননাকারী আখ্যায়িত করে তাদের হত্যার জন্য জঙ্গিদের তৈরি দুটি তালিকা বাংলাদেশি গণমাধ্যমে এসেছে, যাতে অনন্ত বিজয় দাসের নামও ছিল। এ ঘটনার আড়াই মাস আগে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অনন্ত দাসের বন্ধু ও সহব্লগার অভিজিৎ রায়কে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ওই হামলায় অভিজিতের স্ত্রী ব্লগার রাফিদা আহমেদ বন্যাও আহত হন।
লেখকদের সংগঠনের চিঠিতে আরও বলা হয়, একটি ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী ওই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে বলে শোনা যাচ্ছে।
অভিজিৎ খুন হওয়ার এক মাসের মাথায় গত ২৯ মার্চ ঢাকার বেগুনবাড়িতে নিজের বাসা থেকে মাত্র ৫০০ গজ দূরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আরেক ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু। ওই ঘটনায় দুই মাদ্রাসাছাত্রকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
পুলিশকে উদ্ধৃত করে চিঠিতে আরও বলা হয়, হামলাকারীরা ২৭ বছর বয়সী এই ব্লগারকে নিশানা করেছিল, কারণ তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লেখালেখিতে ইসলামের অবমাননা করেছেন বলে তাদের বিশ্বাস।
পেন ইন্টারন্যাশনালের চিঠিতে বলা হয়, ২০১৩ সালের পর বাংলাদেশে আরও অন্তত তিন জন লেখকের ওপর হামলা হয়েছে। সেসব ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হলেও কারও বিচার শুরু হয়নি।
এতে আরও বলা হয়, 'যে লেখক ও সাংবাদিকরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের মত প্রকাশ করছেন, তাদের ওপর সহিংসতার ঘটনা বাড়তে থাকায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার।'
বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটলেও এর জন্য কাউকে গ্রেফতার করতে না পারায় গার্ডিয়ানের চিঠিতে সই করা লেখকেরা শোক ও উদ্বেগ জানিয়েছেন।
নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অনন্ত, ওয়াশিকুর ও অভিজিৎ হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিচারের আওতায় আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন এই লেখকেরা।
ওই চিঠতে বলা হয়, হুমকির মুখে থাকা অন্য ব্লগার ও লেখকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেষ্টা করবে বলে আমরা আশা করি।
গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ান মার্টেল বলেছেন, ব্লগার হত্যার বিষয়টি গুরুতর অপরাধ, এর বিরুদ্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আর এ কারণেই তিনি এই খোলা চিঠিতে সই করেছেন।
বুকার পুরস্কারজয়ী ঔপন্যাসিক মার্টেল জানান, কোনো পশ্চিমা দেশের সরকারের চাইতে তাদের এই চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে অনেক বেশি প্রভাবিত করা যাবে বলে তার ধারনা। কারণ অন্য দেশের সরকারের তরফ থেকে এ ধরনের আবেদন-নিবেদন বা চিঠিকে রাজনীতিকরা আর খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। সে তুলনায় তাদের চিঠি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অনেক বেশি বিক্ষুব্ধ করবে বলে মনে করেন তিনি।