দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারো পাঁচ কোটির বেশি মানুষের শরণার্থী হওয়ার মতো বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে বিশ্ব।
সোমবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
গত ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবসের আগে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শরণার্থী সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উপেক্ষার কারণে যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিকের করুণ মৃত্যু ঘটেছে।
'লাখ লাখ শরণার্থীর অমানবিক জীবনযাপনের' জন্য বিশ্ব নেতাদের ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করে সংস্থাটি।
সূত্র: এএফপি, গার্ডিয়ান, দ্য ইনডিপেনডেন্ট।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব সলিল শেঠি এক বিবৃতিতে বলেন, 'আমাদের যুগের সবচেয়ে ভয়াবহ শরণার্থী সংকটের মুখোমুখি আমরা। লাখ লাখ আশ্রয়হীন নারী-পুরুষ এবং শিশু, যারা প্রাণঘাতী যুদ্ধের মধ্যে বেঁচে থাকার তীব্র লড়াই করেছে। মানব পাচারকারী চক্র এবং বিভিন্ন দেশের সরকার মৌলিক মানবিক দিকটি বিবেচনা করার পরিবর্তে স্বার্থপরের মতো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থটুকুই শুধু হাসিল করে চলেছে।' তিনি বলেন, 'এ সংকট একুশ শতকের একটি চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহল এ সংকটে সাড়া দিতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে।'
'বিশ্ব উদ্বাস্তু সংকট: উপেক্ষার গোপন চক্রান্ত' নামের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারও ৫ কোটিরও বেশি নিরাশ্রয় মানুষ করুণ ও দুর্দশাগ্রস্ত জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতিবেদনে সিরিয়া সংকটের ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে ৪০ লাখ মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এসব শরণার্থীর ৯৫ শতাংশকে আশ্রয় দিয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলো। বর্তমানে লেবাননের প্রতি ৫ জনে একজন সিরিয়ায় শরণার্থী। লেবাননের শরণার্থী গ্রহণের ক্ষমতা এরই মধ্যে সীমা অতিক্রম করে গেছে। সরকারও বেশ নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়েছে। বাধ্য হয়ে লেবাননও উদ্বাস্তুদের প্রবেশের ক্ষেত্রে বেশ কয়েক দফা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে গত বছরের তুলনায় এ বছর দেশটিতে উদ্বাস্তু প্রবেশের সংখ্যা ৮০ শতাংশ কমে গেছে। অথচ নির্মম সত্য হলো, সিরিয়ায় ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরিয়া থেকে আসা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেয়া দেশগুলো উল্লেখ করার মতো কোনো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পায়নি। জাতিসংঘ শরণার্থীদের জরুরি চাহিদা পূরণে তহবিল চেয়ে বারবার আবেদন জানালেও আন্তর্জাতিক মহল সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংঘাতপূর্ণ সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর শরণার্থীদের প্রতি মানবিক সাড়া দিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য বিশ্ব নেতাদের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। সাব-সাহারান দেশগুলো থেকে অন্তত ৩০ লাখ মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে।
ভূমধ্যসাগরীয় উদ্বাস্তু সংকটের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোরও সমালোচনা করেছে অ্যামনেস্টি। আকস্মিকভাবে উদ্বাস্তু উদ্ধারের 'অপারেশন মেয়ার নস্ট্রাম' বন্ধ করে দেওয়ার কারণে সমুদ্রে উদ্বাস্তুদের ডুবে মরার হার বেড়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিবাসী সংকট মানবাধিকার লঙ্ঘনের লক্ষণ - জাতিসংঘ: জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রধান জেইদ রা'দ আল হুসেইন বলেছেন, অভিবাসীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেভাবে দেশ ছাড়ছে তাতে এটা স্পষ্ট, বর্তমানে বিশ্বে দাঙ্গা, সংঘাত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং যুদ্ধ এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে, ঝুঁকিপূর্ণ হলেও মানুষ নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
পাচারকারীদের অর্থ দিয়ে ফেরত পাঠানো ঘুষ দেওয়ার শামিল- ইন্দোনেশিয়া: এদিকে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নিতে যাওয়া নৌকা বোঝাই যাত্রী ও পাচারকারীদের অর্থ দিয়ে ফেরত পাঠানোর ঘটনাকে 'ঘুষ' দেওয়ার শামিল বলে দাবি করেছেন ইন্দোনেশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট ইউসুফ কালা। তিনি বলেন, ঘুষ দিয়ে কার্যসিদ্ধি করতে গিয়ে একজন সাধারণ মানুষ যে অপরাধ করে অস্ট্রেলিয়া সেই অপরাধ করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হবে বলে তিনি জানান। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম 'আনতারা নিউজ এজেন্সি'কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন। গতকাল এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়াগামী একটি নৌকায় পাচারের শিকার বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও শ্রীলংকার নাগরিকদের এবং পাচারকারীদের প্রত্যেককে ৫ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার দিয়ে সে দেশের নৌবাহিনী ফেরত পাঠায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
মালয়েশিয়ায় পাচারকারী চক্রের মূল হোতা চিহ্নিত: বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা পাচারকারী চক্রের মূল হোতা হিসেবে মালয়েশিয়ার কয়েকজন ব্যবসায়ীকে শনাক্ত করেছে সে দেশের পুলিশ। মালয়েশিয়ার অন্তত তিনজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের আড়ালে আন্তর্জাতিক এই পাচার চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে। চক্রের ৭০ জনেরও বেশি সদস্যকে গ্রেফতারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে মালয়েশিয়ার পুলিশ সদর দপ্তরের একটি এলিট ফোর্স তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করেছে বলে জানানো হয়। তবে মূল হোতাদের পরিচয় জানানো হয়নি। গতকাল সোমবার মালয়েশিয়ার স্টার অনলাইনের এক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়।