ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ১১৯তম জন্মবার্ষিকীতে প্রথমবারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতাজি সংক্রান্ত ১০০টি গোপন নথি প্রকাশ করেছেন।
শনিবার ভারতের সরকারি ওয়েবসাইটে নথিগুলোর ডিজিটাল কপি ছাড়া হয় বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।
দেশটির রাষ্ট্রীয় মহাফেজখানায় রক্ষিত নথিগুলো এতদিন গোপন রাখা হয়েছিল।
এরআগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে নেতাজি নিখোঁজ হওয়ার সত্তর বছর পূর্তিতে তার সংক্রান্ত ৬৪টি গোপন নথি প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।
৭০ বছর আগে সুভাস বসু নিখোঁজ হয়েছিলেন— তারপর থেকে তার অন্তর্ধানের বিষয়টি রহস্য হয়েই আছে।
গত অক্টোবরে বসু পরিবারের সঙ্গে এক সাক্ষাতে নেতাজি সংক্রান্ত গোপন নথিগুলো প্রকাশের ঘোষণা দেন মোদি।
শনিবার সকাল ৯টা সাত মিনিটে এক ট্যুইটে মোদি বলেন, আজ সব ভারতবাসীর জন্য একটি বিশেষ দিন। আজ থেকে নেতাজির নথি প্রকাশ হওয়া শুরু হলো।
দিল্লিতে ভারতের জাতীয় মহাফেজখানার ওই অনুষ্ঠানে নেতাজির পরিবারের ১২ জন সদস্যও উপস্থিত ছিলেন।
এরপর থেকে প্রতি মাসে সরকারি ওয়েবসাইটে নেতাজি সংক্রান্ত ২৫টি গোপন নথি প্রকাশ করার পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটির জাতীয় মহাফেজখানা।
দুটি তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তাইপেতে এক বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি মারা যান।
কিন্তু তৃতীয় আরেকটি তদন্ত কমিশন ও অনেকে যাদের মধ্যে নেতাজির বেশ কয়েকজন আত্মীয়ও রয়েছেন তারা বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন।
চন্দ্র বসু নামে নেতাজির এক নাতি বলেন, ওই বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্ব আমি বিশ্বাস করি না। আজ আমরা হয়তো সব উত্তর পাবো না, কিন্তু কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।”
তবে জার্মানিতে বসবাসকারী নেতাজির মেয়ে অনিতা বসু জানিয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি বিশ্বাস করেন তার বাবা বিমান দুর্ঘটনাতেই মারা গেছেন।
সরকারি উদ্যোগে নেতাজির পরিবারের এ সদস্যদের দিল্লি আনা হয়। সকালে তারা প্রথমে যান পার্লামেন্ট ভবনে। সেখানে বিভিন্ন দলের নেতারা নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। সেখান থেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় আর্কাইভ ভবনে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নেতাজি ফাইলের ডিজিটাল সংস্করণ প্রকাশ করেন।
প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ভারতের স্বাধীনতার পর কেন্দ্রীয় সরকার নেতাজির স্ত্রীকে প্রতি মাসে পেনশন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তিনি তা নিতে অস্বীকার করায় নেতাজির কন্যা অনিতাকে মাসে ৬ হাজার টাকা করে পেনশন দেয়া হতে থাকে। স্বাধীনতা সংগ্রামীর পরিবারের সদস্য হিসেবেই এ পেনশন। ১৯৬৫ সালে অনিতার বিয়ে হওয়া পর্যন্ত এই পেনশন চালু ছিল। এছাড়া প্রকাশিত ফাইলে রয়েছে জাপানের রেনকোজি মন্দির থেকে নেতাজির চিতাভস্ম দেশে ফেরত আনা সংক্রান্ত চিঠিপত্র, নেতাজিকে মরণোত্তর ভারতরত্ন সম্মান দেয়া নিয়ে বিতর্ক, বিভিন্ন কমিশনের অপ্রকাশিত তথ্য। কিন্তু কোনো তথ্যেই এটা স্পষ্ট নয় যে নেতাজি ১৯৪৫ সালের পরেও বেঁচে ছিলেন কিংবা বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছিল।
নেতাজির ফাইল প্রকাশ করার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে কি না সেই বিতর্ক আগেও উঠেছিল এবারেও উঠেছে। কংগ্রেস সরাসরি অভিযোগ করেছে, এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কংগ্রেস মুখপাত্র আনন্দ শর্মা শনিবার সংবাদমাধ্যমকে জানান, যেভাবে এই উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় এর পেছনে রাজনীতি রয়েছে।
তিনি বলেন, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রামের বিরোধী শক্তি যারা এই ফাইল প্রকাশের মধ্য দিয়ে তারা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইছে। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এটা তাদের চক্রান্ত। জওহরলাল নেহরুর মতো কংগ্রেসের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদান ছোট করে দেখানোই মোদি-সরকারের উদ্দেশ্য।
নেতাজির পরিবারের সদস্যরা অবশ্য খুশি। তারা মনে করছেন, ৭০ বছর ধরে যা অপ্রকাশিত ছিল, তা প্রকাশ পাওয়াও একটা বড় বিষয়।
অর্ধেন্দু বসু বলেন, অন্তর্ধান সংক্রান্ত ফাইলপত্র পাওয়া যাবে এমন আশা করিনি। তেমন কিছু থাকলে তা কেজিবি বা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাই দিতে পারবে।
চিত্রা বসু বলেন, এই শুরু হওয়াটাই বড় কথা। প্রধানমন্ত্রীকে তিনি বলেছেন, সব ফাইল প্রকাশিত হওয়ার পর নতুন করে একটি কমিশন যেন গঠন করা হয় রহস্য উন্মোচনে।
চন্দ্র বসু বলেন, এত দিন সব সরকারই এই সব তথ্য চেপে ছিল। মোদিই তা প্রকাশ করলেন। মোদির সরকারই সবচেয়ে স্বচ্ছ।
দিল্লিতে ভারতের জাতীয় মহাফেজখানার অনুষ্ঠানে অনিতা উপস্থিত থাকতে পারেননি।