মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই প্রার্থী ডেমোক্রেটিক পার্টির হিলারি ক্লিনটন ও রিপাবলিকান পার্টির ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় বিতর্কে মুখোমুখি হয়েছেন।
স্থানীয় সময় রোববার সন্ধ্যায় (বাংলাদেশে সোমবার সকাল) সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে পূর্বনির্ধারিত এই বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।
সিএনএনসহ অধিকাংশ মার্কিন টিভি নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেটে ৯০ মিনিট স্থায়ী এই বিতর্ক সম্প্রচার করেছে।
আজকের বিতর্ক ছিল ট্রাম্পের জন্য অনেকটা বাঁচা-মরার লড়াই। অশ্লীল ও আপত্তিকর একটি ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে গত তিন দিন ট্রাম্প নিজের দলের নেতাদের কাছেই তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছেন।
একের পর এক শীর্ষ নেতারা ট্রাম্পের প্রতি নিজেদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
অনেকেই ট্রাম্পকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোরও অনুরোধ করেছেন। ট্রাম্প নিজে অবশ্য সরে দাঁড়ানোর সব দাবি এক কথায় নাকচ করে দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় বিতর্ক ছিল ট্রাম্পের জন্য শেষ সুযোগ।
বিতর্কে কি বললেন তারা:
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বিতর্কে যা বললেন:
রয়টার্স জানিয়েছে, মিসৌরির সেন্ট লুইস ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে এ বিতর্কে ট্রাম্প নির্বাচনে জয়ী হলে হিলারির ই-মেইল কেলেঙ্কারির বিষয়ে বিশেষ একজন প্রসিকিউটর নিয়োগ দেবেন। বারাক ওবামার পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ২০০৯-২০১৩ পর্যন্ত সময়ে হিলারি ব্যক্তিগত সার্ভার থেকে গুরুত্বপূর্ণ ইমেইল লেনদেন করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ক্ষতি করেছেন বলে মন্তব্যপ করেন ট্রাম্প।
ওই সময় হিলারির আদান-প্রদান করা ৩০ হাজার ৬৮টি ইমেইল নিয়ে তদন্ত করে এফবিআই। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি ইমেইলে গোপনীয় তথ্য পাওয়া গেছে জানালেও হিলারি যে জেনেশুনে এ কাজ করেছেন তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয় এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে। ওই ঘটনার উল্লেখ করে বিতর্কে হিলারিকে উদ্দেশ্য করে ট্রাম্প বলেন, আপনার অবশ্যই লজ্জিত হওয়া উচিত। আপনাকে জেলে যেতে হবে।
প্রতিক্রিয়ায় হিলারি বলেন, ট্রাম্পের মত মনমানসিকতার কেউ হোয়াইট হাউজে নেই বলে তিনি স্বস্তিবোধ করছেন।
সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প বলেন, আপনাকে জেলে যেতে হবে।
২৭ সেপ্টেম্বর দুই প্রার্থী এর আগে প্রথম বিতর্কে মুখোমুখি হন।
ওই জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, সেই বিতর্কে অধিকাংশ ভোটার হিলারিকেই জয়ী করেছেন।
দ্বিতীয় বিতর্কের ঠিক দুদিন আগে নারীদের নিয়ে বেফাঁস মন্তব্যের পুরনো এক টেপ ফাঁস হওয়ায় নতুন করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ট্রাম্প। এরইমধ্যে নিজ দলের বহু নেতার সমর্থন হারিয়েছেন তিনি।
রোববার দেড় ঘণ্টার বিতর্কের একপর্যায়ে সেই টেপের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ফাঁস হওয়া অডিও টেপ নিয়ে তিনি ‘বিব্রত’ তবে সেজন্যখ তিনি ভোটারদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।
প্রসঙ্গত: ২০০৫ সালের ওই টেপে এনবিসি টিভির উপস্থাপক বিলি বাশের সঙ্গে কথপোকথনে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, ‘তুমি যদি তারকা হও, তবে মেয়েদের নিয়ে যা কিছু করতে পার।
ওই কথপোকথনে বিবাহিত এক অভিনেত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে উদগ্র আগ্রহের কথাও বলতে শোনা যায় ট্রাম্পকে, যিনি বর্তমানে তৃতীয় স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে ঘর করছেন।
মেলানিয়া বলেন, ট্রাম্পের ওই বক্তব্যু কোনোভাবেই ‘গ্রহণযোগ্যথ নয়। যে স্বামীকে তিনি চেনেন তার সঙ্গে একে মেলানো যায় না। তারপরও তিনি আশা করছেন, আমেরিকার জনগণ ট্রাম্পকে মাফ করে দেবেন।
বিতর্কে ফাঁস হওয়া ওই টেপকে ‘লকার রুমের কথা’বলে উড়িয়ে দেন ট্রাম্প— নারীদের প্রতি তার যথেষ্ট ‘শ্রদ্ধা’ আছে বলেও মন্তব্য করেন এ রিপাবলিকান প্রার্থী।
এ প্রসঙ্গে বিতর্কে হিলারির স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকেও টেনেছেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, আমারটা কেবল কথা, আর বিল ক্লিনটনতো করে দেখিয়েছেন।
এ বিষয়ে হিলারি বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্যই দেখিয়ে দেয়, কেন তিনি হোয়াইট হাউজের জন্য অনুপযুক্ত। ওই ভিডিও তাকে উপস্থাপন করে না বলে দাবি করছেন ট্রাম্প; কিন্তু আমার ধারণা, যারা এটি শুনেছেন তারা বুঝতে পারছেন, এটি কেবলমাত্র তাকেই উপস্থাপন করে, বলেন হিলারি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিতর্কের আগে আগে বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহ ও ধর্ষণের অভিযোগকারী তিন নারী- পলা জোনস, জুয়ানিতা ব্রডরিক ও ক্যাথলিন উইলির সঙ্গে দেখা করেন ট্রাম্প।
এদের মধ্যে পলা ১৯৯১ সালে বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ আনেন। দোষ স্বীকার বা ক্ষমা না চেয়ে ৮ লাখ ৫০ হাজার ডলারে ওই ঘটনার মীমাংসা করেছিলেন আরকানসাসের তখনকার গভর্নর ক্লিনটন।
এরও আগে ১৯৭৮ সালে ক্লিনটনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেন জুয়ানিতা; আর ১৯৯৩ সালে হোয়াইট হাউজের সাবেক কর্মী ক্যাথলিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ‘লাঞ্ছিত করার’ অভিযোগ আনেন। তাদের কারও অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
হিলারির সঙ্গে দ্বিতীয় বিতর্কের আগে ট্রাম্প ক্যাথি শেলটনের সঙ্গেও দেখা করেন। ১২ বছর বয়সে ধর্ষিত হওয়া ক্যাথির বিরুদ্ধে লড়েছিলেন হিলারি।
তখনকার শিক্ষানবীস আইনজীবী হিলারির কারণেই প্রমাণিত হওয়ার পরও ধর্ষক অভিযোগ কম শাস্তি পেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিতর্কের সময় এ চার নারী দর্শক সারির সামনে বসা ছিল বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়।
হিলারির মুখোমুখি হওয়ার আগে ট্রাম্পের এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘লোক দেখানো’ অ্যাখ্যা দিয়ে হিলারি শিবির বলছে, এ প্রবণতা প্রতিযোগিতাকে ‘ধ্বংসের তলানিতে’ নিয়ে যাবে। সূত্র রয়টার্স।