মার্কিন নির্বাচনী প্রচারের সময় জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন তুলে নেয়ার কথা জানিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প তবে ভোটে জিতে সুর পাল্টেছেন তিনি।
মঙ্গলবার নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্যারিসসহ আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর বিষয়ে তিনি ‘খোলা মন’ নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, ভোটের প্রচারে ট্রাম্প বারবারই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাতিলের কথা বলে এলেও তার নতুন অবস্থান আগের চেয়ে ‘নরম’।
জলবায়ু পরিবর্তনকে যিনি ‘ধাপ্পাবাজি’ বলেছিলেন সেই ট্রাম্পই সাক্ষাৎকারে বলেন- মানুষের কার্যকলাপের সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ‘কিছু সম্পর্ক’ আছে বলে তিনি মনে করেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে প্রথম এক মাসে কী কী করবেন:
এমন একটি রূপরেখা ভোটের আগে দেয়া এক বক্তৃতায় ট্রাম্প যা বলেছিলেন:
জাতিসংঘের জলবায়ু তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের যে অর্থ দেয়ার কথা সেই টাকা ট্রাম্প ব্যুয় করতে চান যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামো সংস্কারে আর এরমধ্য দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে তার।
এ মাসের শুরুতে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ট্রাম্পের ‘অন্তর্বর্তী’ দলের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তিও রয়টার্সকে বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসমর্থন তুলে নিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারেন ট্রাম্প।
মঙ্গলবার ওই বিষয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি খুব সুক্ষ্মভাবে ব্যাপারটা দেখছি— এ বিষয়ে আমি খোলা মনে ভাবছি।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমিয়ে আনা; বিলুপ্তির হুমকিতে থাকা প্রাণী ও উদ্ভিদ রক্ষা; খরা, বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধে ২০১৫ সালে হওয়া প্যা রিস চুক্তিতে দুইশ’র মত দেশ অনুসমর্থন দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন প্রত্যারহার করে নিলে প্যা রিস উদ্যোিগ মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আগামী ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন ট্রাম্প। ভোটের আগে তার যেসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছিল, তার অনেকগুলাতেই অবস্থান বদলের ইংগিত মিলেছে ইতোধ্যে।
ট্রাম্পের ‘অন্তর্বর্তী’ দল ইতোমধ্যে জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে হিলারি ক্লিনটনের ব্যক্তিগত ইমেইল সার্ভার ব্যবহার এবং ক্লিনটন ফাউন্ডেশন নিয়ে আর কোনো তদন্ত চালাবে না নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের প্রশাসন।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজেও বলেন, আমি হিলারিকে আঘাত করতে চাই না, সত্যিই চাই না। এমনিতেই নানা ধরনের ভোগান্তির মধ্যে্ দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে।
ট্রাম্প যদি হিলারির বিরুদ্ধে ‘স্পেশাল প্রসিকিউটর’ নিয়োগ না করেন, তাহলে তিনি নির্বাচনী প্রচারে প্রায় প্রতিদিন করা একটি প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবেন। ওইসময় তিনি প্রায়ই উচ্চারণ করতেন ‘দুর্নীতিবাজ হিলারি’, সঙ্গে তার সমর্থকরা ধুয়ো তুলছেন- ‘তাকে জেলে পাঠাও’।
দায়িত্ব বুঝে নিয়ে প্রথম কোন পদক্ষেপ নেবেন সে বিষয়টি জানিয়ে সোমবার এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ‘ট্রান্স প্যা সিফিক পার্টনারশিপ ট্রেড ডিল’ বাতিলের বিষয়ে আগের অনড় অবস্থানের কথাই বলেছেন। তবে স্বাস্থ্যো কর্মসূচি ‘ওবামাকেয়ার’ বাতিল, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলা কিংবা অভিবাসী বিতারণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে সেখানে কিছু বলা হয়নি।
সাক্ষাতকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি জলবায়ু পরিবর্তন এবং আমেরিকার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে ভাবছেন। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক চুক্তির কারণে মার্কিন কোম্পানিগুলোর কত খরচ হবে- মূলত সেটাই তার ভাবনার বিষয়।
জলবায়ু বিষয়ে ট্রাম্পের সর্বশেষ এই অবস্থানে বিস্মিত হয়েছেন ‘অন্তর্বর্তী’ দলের জ্বালানি ও পরিবেশ বিষয়ক দুই উপদেষ্টা।
রয়টার্স লিখেছে, অন্য বেশ কয়েকটি বিষয়ের মত বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে ট্রাম্পের এই ‘অবস্থান বদলে’ মনে হচ্ছে, নির্বাচনী প্রচারে তিনি যেমনটা বলেছিলেন ওভাল অফিসে তার অবস্থান সেরকম থাকবে না।
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া ওই সাক্ষাৎকার ট্রাম্পের ডানপন্থি অনেক সমর্থককে ক্ষুব্ধ করেছে বলে রয়টার্সের খবর।
ট্রাম্পের চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট স্টিভ বেননের সাবেক প্রতিষ্ঠান ব্রেইবার্ট নিউজ মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম- বিশ্বাসভঙ্গ: ক্লিনটনের ইমেইল নিয়ে তদন্ত ‘এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক নন’ ট্রাম্প।
বারাক ওবামার প্রথম মন্ত্রিসভায় থাকার হিলারি ব্যক্তিগত সার্ভার থেকে মেইল পাঠিয়ে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ভঙ্গ করেছিলেন বলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা অভিযোগ করে আসছেন। এ নিয়ে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) তদন্তের মুখোমুখিও হতে হয়েছে সাবেক ফার্স্টলেডি হিলারিকে।
এক বছরের তদন্ত শেষে এফবিআইই এ বছরের জুলাইয়ে জানায়, ইমেইল পাঠানোর ব্যাপারে হিলারি অসতর্ক থাকলেও সেখানে অন্যায় কিছু পাওয়া যায়নি।
হিলারি ও তার স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল প্রতিষ্ঠিত ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে বিদেশি দাতাদের অনুদান নিয়েও তদন্ত চলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে হিলারি ওই ফাউন্ডেশনের দাতাদের অনেককেই সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন- এমন অভিযোগ উঠলেও এখন পর্যন্ত তার সত্যতা মেলেনি।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ব্যবসা পরিচালনা ও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের মধ্যেি কোনো স্বার্থের সংঘাত ঘটবে না বলেই তিনি মনে করছেন।
আইন পুরোপুরি আমার পক্ষে, প্রেসিডেন্ট পদের সঙ্গে কোনোরকম স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকবে না। আমি যা করতে চাই, তার তুলনায় আমার কোম্পানি গুরুত্বহীন।
রয়টার্স জানিয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য করা যুক্তরাষ্ট্রের ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ আইন প্রেসিডেন্টের ওপর প্রযোজ্য হবে না। তবে ঘুষ, সম্পদের হিসাব ও বিদেশি সরকারগুলোর কাছ থেকে উপহার নেয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকতে হবে রিয়েল এস্টেট টাইকুন ট্রাম্পকে।
ট্রাম্প নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পদকে না জড়ানোর কথা বললেও বিরোধীরা তার ওই বক্তব্যে ভরসা রাখতে পারছেন না।
জয়ী হওয়ার পর ট্রাম্পের সঙ্গে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মরিসিও মাক্রির টেলিফোন আলাপ এবং জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ট্রাম্পকন্যা ইভাঙ্কার উপস্থিতিও বিরোধীদের সন্দেহকে উসকে দিচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় বিরোধিতা করা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের স্পিকার পল রায়ানসহ রিপাবলিকান শীর্ষনেতারা ট্রাম্পের ট্রিলিয়ন-ডলার অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে সমর্থন দেবেন কী না, এমন প্রশ্নের জবাবে সাক্ষাতকা নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বলেন, এখন তারা আমাকে ভালোবাসে।