ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা জয়রামের মৃত্যুতে রাজ্যে সাত দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির তামিলনাড়ু রাজ্য সরকার এ শোক ঘোষণা করে।
সোমবার রাতে রাজ্য মুখ্যসচিব পি রামা মোহনা রাও এক প্রজ্ঞাপনে সাত দিনের এ শোক ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার থেকে এ শোক পালন শুরু হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, শোক চলাকালে রাজ্যের সব সরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও রাজ্য সরকার তামিলনাড়ুর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে।
জয়ললিতা জয়রামের মৃত্যুর পর পরই অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগামের (এআইএডিএমকে) নতুন নেতা নির্বাচিত করা হয়েছে পনিরসেলভামকে। এরপর সোমবার রাতেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ নেন।
এদিকে, জয়ললিতাকে হারিয়ে তামিলনাড়ুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তুমুল জনপ্রিয় এ নেতার জন্য মাতম করছে রাজ্যের মানুষ।
স্থানীয় সময় সোমবার দিবাগত রাত ১১টা ৩০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে একটানা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সন্ধ্যায় হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন তামিলদের ‘আম্মা’ জয়ললিতা। তার শারীরিক অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন।
চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন তিনি। সোমবার সকাল থেকে তার অবস্থার অবনতি হয়।
জয়ললিতার আরোগ্য কামনা করে ভারতজুড়ে প্রার্থনা হয়। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ দেশের সর্বস্তরের নেতারা তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
জ্বর ও পানিশূন্যতা নিয়ে ২২ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন জয়ললিতা। এরপর জীবাণুর সংক্রমণ হতে থাকে তার শরীরে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা দেখা দেয়।
ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা জয়ললিতা তামিলনাড়ুর মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। একসময় অভিনয় দিয়েও মানুষের মন জয় করেছেন তিনি। এ রাজ্যের ‘আম্মা’ বলা হয় তাকে।
আম্মার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাস্তায় মানুষের ঢল নামে। চেন্নাইয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালের সামনে জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ।
সোমবার দিবাগত রাতে জয়ললিতার মৃত্যু নিয়ে হাসপাতাল ও তার দল এআইএডিএমকের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়। দলের নেতাকর্মীরা তার মৃত্যু মেনে নিতে পারছিলেন না।
অবশেষে দলটি তাদের টুইটার পেজে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে লেখে, ‘আমাদের প্রিয় নেত্রী, ভারতের লৌহমানবী জয়ললিতা আর নেই।’
জয়ললিতা সিনেমা জগতে জয়া নামেই পরিচিত ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে রাজনীতিতে আসার আগে শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। নাটকীয়তায় ভরা তার জীবন।
মুখ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থায় দুবার কারাবন্দি হন তিনি। সর্বশেষ ২০১৪ সালে অর্থ আত্মসাতের মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন। তবে শেষ পর্যন্ত মামলা থেকে অব্যাহতি পান তিনি।
ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে তামিলনাড়ুকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যান জয়া। তার নেতৃত্বে তামিলনাড়ু সব দিক থেকেই এগিয়ে গেছে।
অভিনেত্রী থেকে রাজনীতিবিদ:
অভিনেত্রী থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া জয়ললিতার অজানা কিছু তথ্য পাঠকের জন্য তুলে ধরেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
জয়ললিতার মা স্থানীয় একটি নাটকের দল ও তামিল চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী ছিলেন। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন জয়ললিতা। শুরুটা ছিল শিশুশিল্পী হিসেবে। ১৫ বছর বয়সে তিনি ‘চিন্নাদা গোম্বে’ চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক সাফল্য পান। তিনি উচ্চাঙ্গসংগীত, পিয়ানো এবং ভরতনাট্যম, মণিপুরী ও কত্থক নাচসহ ধ্রুপদি বিভিন্ন নাচের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
জয়ললিতাকে বিপ্লবী নেতা বলা হয়। তবে ঘনিষ্ঠজনের কাছে তিনি ‘আম্মা’। ‘আয়িরাধিল ওরুভান’ চলচ্চিত্রে তিনি তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা এম জি রামাচন্দ্রনের সঙ্গে অভিনয় করে সাফল্য পান। তিনি ১৯৬৮ সালে বলিউড তারকা ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে ‘ইজ্জত’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রের জগতে পা বাড়ান।
১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত জয়ললিতার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের সুবর্ণ সময়। এই সময়কালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রীদের একজন ছিলেন। তিনি ১৪০টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে ১২০টিই ছিল ব্লকবাস্টার। তিনি যে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতেন, সেখানে নায়কের চরিত্রটি মোটেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না বলে কথিত আছে।
বিগত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে জয়ললিতা তখনকার জনপ্রিয় অভিনেতা এম জি রামাচন্দ্রনের সঙ্গে অনেকগুলো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। দুজনের মধ্যে বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। রামাচন্দ্রনই তাঁকে রাজনীতিতে আগ্রহী করেন। রামাচন্দ্রন যখন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী, তখন ১৯৮২ সালে তাঁর দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগামে (এআইএডিএমকে) যোগ দেন জয়ললিতা। ওই বছরই তিনি দলের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান।
১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত জয়ললিতা রাজ্যসভায় এআইএডিএমকের প্রতিনিধিত্ব করেন। ইংরেজিতে সাবলীল হওয়ায় এবং ভারতের বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষায় দক্ষতার কারণে দল তাঁকে দিল্লির রাজনীতিতে সক্রিয় করে। ১৯৮৭ সালে রামাচন্দ্রনের মৃত্যুর পর এআইএডিএমকে দলে বিভাজন তৈরি হয়। একদল ছিল রামাচন্দ্রনের স্ত্রী জানকির দিকে আর আরেক দল ছিল জয়ললিতার সঙ্গে। ১৯৮৯ সালে জয়ললিতা বিধানসভার সদস্য হন। তিনি সেবার বিধানসভার প্রথম নারী হিসেবে বিরোধীদলীয় নেত্রী হন। ওই বছরই এআইএডিএমকের দুই অংশ একত্রিত হয় এবং জয়ললিতাকে তাদের নেতা মেনে নেয়।
বিরোধীদলীয় নেতা থাকাকালে সরকারি দলের বিধায়কদের হাতে তিনি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন। বিধানসভার অধিবেশন শেষে তিনি বাইরে বের হলে গণমাধ্যম তাঁর ছবি ও লাঞ্ছিত হওয়ার খবর ফলাও করে প্রচার করে। এতে করে তিনি সাধারণ জনগণের সহানুভূতি পান। ১৯৯১ সালে জয়ললিতা তামিলনাড়ুর প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হন। রাজ্যের কনিষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রীও তিনিই।
পালকপুত্র সুধাগরনের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান করে আলোচিত-সমালোচিত হন জয়ললিতা। ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে দেড় লাখের বেশি অতিথি ছিলেন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ললিতার দলের ব্যাপক ভরাডুবি হয়। ২০০১ সালে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেন জয়ললিতা। সুপ্রিম কোর্ট এক আদেশে বলেন, ফৌজদারি অপরাধের মামলা চলমান থাকার সময় তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। পরবর্তী সময়ে তিনি দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান। ২০০৩ সালে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পুনর্বহাল হন।
২০১১ সালে জয়ললিতা তৃতীয় মেয়াদে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু ২০১৪ সালে একটি রায়ে তাঁর চার বছরের কারাদণ্ড হয়। এর ফলে ভারতের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালনের অযোগ্য ঘোষিত হন। একই সঙ্গে বিধানসভার সদস্যপদ হারান। ২০১৫ সালে জয়ললিতা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের যাবতীয় অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান। উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আবারও মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি। আর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি মাত্র এক রুপি বেতন নিতেন।