আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও থামছে না মিয়ানমার— দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর বীভৎস হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে প্রাণ বাঁচাতে গতকাল পর্যন্ত চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
সিএনএন গত বৃহস্পতিবার জানায়, রোহিঙ্গাদের বাস্তব অবস্থা দেখতে বৃহস্পতিবার মিয়ানমারে প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে রাখাইন রাজ্য সরকারের সচিব টিম মং সুয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাট্রিক মার্ফিকে রাখাইনের সহিংসতাকবলিত এলাকাগুলোতে যেতে দেয়া হবে না।
তিনি শুধু ইয়াঙ্গুন গিয়ে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিসহ অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন, রাখাইনের রাজধানী সিত্তে গিয়ে গভর্নরের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে জানান তিনি।
ওয়াশিংটনে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং লিনকে বৃহস্পতিবার তলব করেন প্যাট্রিক মার্ফি।
এ সময় অং লিনকে জানানো হয়েছে, রাখাইনের গ্রামগুলোতে হামলাসহ সেখানকার সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
এ সময় প্যাট্রিক মার্ফি বলেন, মিয়ানমারের প্রকাশ্যে স্বীকার করা উচিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে— পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফিরিয়ে নেবে।
এদিকে, গতকাল রাখাইনের সহিংসতা নিয়ে অন্য দেশগুলোকে নাক গলানোর বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে রাশিয়া।
মস্কো মনে করে এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভার বরাত দিয়ে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা স্পুটনিকএ কথা জানান।
জাখারোভা গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করা হলে তাতে করে আন্তধর্মীয় সংঘাতের আরও অবনতি হতে পারে। আমি জোর দিয়ে বলছি, মিয়ানমারে সব ধর্মের নেতাদের নিয়ে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, আমরা তাকে স্বাগত জানাই।’
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণভাবে যারা বাস্তুচ্যুত হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ তাদের বাড়িঘরে ফিরিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই সংকটে অন্য যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও একই রকম পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাখাইনে সহিংসতার জন্য মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা, জাতিগত নিধন ইত্যাদি অভিযোগ ক্রমশ জোরের সঙ্গেই বলছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, ওআইসি ছাড়াও বিভিন্ন দেশ। এরপরও সহিংসতা বন্ধ করছে না মিয়ানমার। উল্টো জাতিগত নিধনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছে।
এছাড়া মিয়ানমারকে অবিলম্বে সেনা অভিযান স্থগিত ও রোহিঙ্গাদের প্রতি সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
বুধবার তার ওই আহ্বানের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অতিরিক্ত সহিংসতার খবরে উদ্বেগ জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়। নিরাপত্তা পরিষদে যে কোনো প্রস্তাব আটকে দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের মধ্যে মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত চীনের সঙ্গে রাশিয়াও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তথ্য:
মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যে পরিকল্পিতভাবেই রোহিঙ্গা মুসলিমদের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে তার অনেক প্রমাণ তাদের কাছে আছে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
স্যাটেলাইট থেকে তোলা রাখাইন রাজ্যের অনেক ছবি বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, সেখানে গত তিন সপ্তাহে আশিটিরও বেশি স্থানে বিশাল এলাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো এই কাজ করছে বলে সংগঠনটি তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের পোড়ামাটি নীতির ওপর সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করে যে রিপোর্ট দিয়েছে তা পড়লে বেশ বিচলিত হতে হয়।
স্যাটেলাইটে তোলা ছবি, স্যাটেলাইটে আগুন সনাক্ত করতে পারে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং ওই অঞ্চল থেকে পাওয়া ছবি ও মানুষের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি দেখতে পেয়েছে যে গত ২৫শে আগস্টের পর থেকে মোট ৮০টি জায়গায় ব্যাপক মাত্রায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে এমন সংঘবদ্ধ দলগুলো একসাথে মিলে এই জ্বালাও পোড়াও চালাচ্ছে।
তারা গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে এবং পলায়নপর মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে।
অ্যামনেস্টির একজন কর্মকর্তা তারানা হাসান বলেন, এটা পরিষ্কার যে সুপরিকল্পিতভাবে এসব সহিংসতা চালানো হচ্ছে। প্রমাণ হিসেবে অ্যামনেস্টি বলছে, যেসব জায়গায় আগুন দেয়া হয়েছে সেই জায়গাগুলোর আগের চার বছরের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে তারা কোন অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেখতে পাননি। বেছে বেছে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতেই আগুন দেয়া হয়েছে।
যেসব গ্রামে রোহিঙ্গা এবং রাখাইনরা পাশাপাশি বাস করে, সেখানে রাখাইন বাড়িগুলো আগুনের হাত থেকে বেঁচে গেছে বলে অ্যামনেস্টি এই রিপোর্টে উল্লেখ করেছে।
ওদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কট নিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আজ আরো একদফা বেড়েছে।
লন্ডন সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্মী বাহিনীর সহিংসতা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং অবিলম্বে এটা বন্ধ করতে হবে।
মি. টিলারসন বলেছেন, অং সান সুচি যে কঠিন এবং জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, সেটা আমরা বুঝতে পারছি। জাতিগত পরিচয়ে বাইরে গিয়ে মানুষের সাথে আচরণ কী হবে আমরা সবাই সেটা জানি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তাই সমর্থন করে। কিন্তু এই সহিংসতা অবশ্যই থামাতে হবে, মানুষের ওপর এই নির্যাতন থামাতেই হবে। অনেকেই বলছেন এটা জাতিসত্তা নির্মূলের ঘটনা, একেও থামাতে হবে বলে মি. টিলারসন উল্লেখ করেন।
লন্ডনে এই সংবাদ সম্মেলনে মি. টিলারসনের পাশে ছিলেন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বন্ধে মিয়ানমারের প্রকৃত ক্ষমতাধর নেতা অং সান সুচিকেই তার নৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অং সান সুচি যেসব মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন, যেভাবে তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, সেই জন্য তার প্রতি আমার প্রশংসা কারো কথায় কমে যাবে না। আমি জানি বিশ্বব্যাপী বহু মানুষও একইভাবে তার গুণমুগ্ধ। কিন্তু রাখাইনের মানুষের দুর্দশা লাঘবের জন্য সুচিকে এখন তার নৈতিক কর্তৃত্ব ব্যবহার করতে হবে বলে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন। সূত্র বিবিসি বাংলা।
রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে সেনাবাহিনী: এইচআরডব্লিউ
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলোতে আগুন লাগাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
গতকাল এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, রোহিঙ্গাদের জোর করে তাড়িয়ে দিয়ে তাদের বাড়িঘরে এভাবে আগুন লাগিয়ে দেয়াটা এটাই প্রমাণ করে, সেনাবাহিনী রাখাইন থেকে এই সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে।
সংগঠনটি স্যাটেলাইটে ধারণ করা রাখাইনের কিছু নতুন ছবি এবং সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করেছে। সে অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাখাইনের ৬২টি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়।