নব্বইয়ের দশকে করা প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় ‘যাচাইয়ের মাধ্যমে’ বাংলাদেশে থাকা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির নেত্রী অং সান সু চি।
মঙ্গলবার সকালে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে তিনি এ কথা জানান।
ক্রমবর্ধমান রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে তার সরকার খতিয়ে দেখছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সতর্কবার্তায় মিয়ানমার সরকার ভীত নয় বলে জানান সু চি।
ভাষণে তিনি বলেন, যে শরণার্থীরা মিয়ানমারে ফিরতে চায়, ওই চুক্তির আওতায় আমরা যে কোনো সময় তাদের ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রস্তুত। আর যে শরণার্থীরা মিয়ানমার থেকে গেছে বলে চিহ্নিত হবে, কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার পূর্ণ নিশ্চিয়তা দিয়ে আমরা তাদের গ্রহণ করব।
রাখাইনের পরিস্থিতির কারণ ওই রাজ্যের মুসলমানদের পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার কথা স্বীকার করলেও বক্তৃতার কোথাও তাদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে উল্লেখ করেননি সু চি।
রাখাইন থেকে মুসলমানরা কেন পালিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে, তা মিয়ানমার সরকার খুঁজে বের করতে চায় জানিয়ে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাখাইন পরিদর্শনে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি।
ভাষণে সু চি দাবি করেন, ৫ সেপ্টেম্বরের পর রাখাইনে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অভিযান চালানো হয়নি— সঙ্কট নিরসনে কফি আনান কমিশন যে সুপারিশ করেছে, তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকার বাস্তবায়ন করতে চায়।
তিনি বলেন, আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকারাবদ্ধ— রাখাইনের সবার দুর্দশার বেদনা আমরা গভীরভাবে অনুভব করছি।
মিয়ানমার সরকার রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে এবং বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনে সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির নেত্রী সু চি।
অং সান সু চি বলেন, আমরা সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বেআইনি সহিংসতার নিন্দা জানাই— রাজ্যজুড়ে আইনের শাসন, স্থিতিশীলতা ও শান্তি পুনঃ প্রতিষ্ঠায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সেখানে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ রয়েছে। আমাদের সবার অভিযোগ শুনতে হবে। আমাদের পদক্ষেপ নেয়ার আগে নিখাঁদ প্রমাণের ভিত্তিতে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে বলে জানানন তিনি।
তিনি বলেন, আমাদের তরুণ ও ভঙ্গুর দেশ আমরা অনেক সমস্যার মুখোমুখি। তবে সবার সঙ্গে তা সামলিয়ে উঠতে হবে। মুহূর্তেই আমরা কোনো বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারি না।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিতর্কিত এই নোবেলজয়ী তার বক্তৃতায় আরো জানান, বার্মা একটি জটিল জাতি। বর্তমানে উদ্ভূত সমস্যা এর জটিলতা আরো ঘণীভূত করেছে। তবে যত দ্রুত সম্ভব সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সংকট সমাধানের প্রত্যাশা করে জনগণ।
রাখাইনে তার দেশের সেনাবাহিনীর নির্বাচারে রোহিঙ্গাদের হত্যা ও অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি সু চি। বরং তিনি বলেছেন, ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সেখানে কোনো 'সশস্ত্র সংঘর্ষ অথবা ক্লিয়ারেন্স অপারেশন' হয়নি।
রোহিঙ্গা সংকেটর পর এই প্রথম জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন অং সান সু চি। এই ভাষণকে কেন্দ্রকে গোটা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের ব্যাপক কৌতূহল ছিল। কারণ রোহিঙ্গাদের শান্তি ফিরিয়ে আনতে তার ইতিবাচক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চিকে শেষ সুযোগ কাজে লাগানো কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।
তবে মঙ্গলবারের ভাষণে সু চির সেই সুযোগ কাজের লাগানোর কোনো আলামত বোঝা যায়নি। সু চি শুধু এইটুকু বলেছেন, রাখাইন থেকে মুসলমানদের পালিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার খবরে তারা উদ্বিগ্ন।
জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংসতায় গত ২৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশ আশ্রয় নিয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট রাখাইনে বেশ কয়েকটি তল্লাশিচৌকিতে কোনো এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী হামলা চালায়। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্যসহ নিহত হন ৭০ জনের বেশি মানুষ। ওই হামলার জন্য দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে দায়ী করে তাদের ওপর নির্বাচারে নির্যাতন ও হত্যা শুরু করে। এরপর থেকেই রাখাইন ও আরাকান রাজ্য থেকে কক্সবাজারের টেকনাফসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নাফ নদী পার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। সহিংসতায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে প্রায় ৫ হাজার মানুষ।