জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বুধবার মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে।
সোমবার নিরাপত্তা পরিষদের এক সর্বসম্মত বিবৃতিতে রাখাইনে সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত ক্ষমতা চর্চা বন্ধ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। সেইসঙ্গে রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
এরই প্রতিক্রিয়ায় সু চির দপ্তর বিবৃতিতে জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার পরিস্থিতির অবনতি হবে।
বিবৃতিতে আরো আছে, কেবল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় চেষ্টাতেই এ সমস্যার সমাধান আসতে পারে বলে তার দেশ বিশ্বাস করে।
সু চির দপ্তরের বিবৃতিতে আরো বলা হয়, নিরাপত্তা পরিষদের ওই প্রেসিডেন্সিয়াল স্টেটমেন্ট বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চলমান আলোচনার জন্য ‘মারাত্মক ক্ষতিকর’ হতে পারে।
বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, মানবিক কারণে আপাতত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হলেও তাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে হবে। এ সমস্যার পেছনে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই; সমস্যার সৃষ্টি ও কেন্দ্রবিন্দু মিয়ানমারে সমাধানও সেখানে।
আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার মধ্যে মিয়ানমার ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাপনায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা জানায় তারা তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘকে যুক্ত করাসহ কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রস্তাবের কোনো জবাব না দিয়েই গত ৩১ অক্টোরব রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দেরির জন্য উল্টো বাংলাদেশকে দোষারোপ করেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর সু চির দপ্তরের মহা পরিচালক জ তাই।
তবে এ মাসের শুরুতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশে এসে সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে নিজের চোখে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিমন হেনশ বলেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা মিয়ানমার সরকারেরই দায়িত্ব।
আর কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ) এক সর্বসম্মত প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে জরুরি পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
বহুপক্ষীয় উদ্যোগের বিরোধিতায় সু চি তার বিবৃতিতে বলেন, এ বিষয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের আলোচনা ‘মসৃণভাবে ও প্রত্যাশা অনুযায়ীই চলছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে আগামী ১৬ ও ১৭ নভেম্বর মিয়ানমার সফরের আমন্ত্রণ জানানোর কথাও সু চি বলেন।
মাহমুদ আলীর এক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের মিয়ানমারে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে দেশটির সেনাবাহিনী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি প্রস্তাবও ওয়াশিংটন বিবেচনা করছে।
রোহিঙ্গা সঙ্কটের অবসানে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সোমবার নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব পাসের উদ্যোগ নিলেও মিয়ানমারের দুই মিত্র দেশ ভেটো ক্ষমতার অধিকারী রাশিয়া ও চীনের কারণে তা শেষ পর্যন্ত বাদ দেয়া হয়।
সে প্রসঙ্গ টেনে সু চি তার বিবৃতিতে বলেন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার’ বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জোরালো অবস্থান নিয়েছে একটি রাষ্ট্র। মিয়ানমার তাদের ওই অবস্থানকে সাধুবাদ জানায়।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতি:
রোহিঙ্গা সংকটের অবসান চেয়ে সোমবার বেশকিছু প্রস্তাব সহকারে একটি বিবৃতি দেয় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা।
যেখানে মিয়ানমার সরকারের প্রতি রাখাইনে রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর ওপর নৃশংসতা ও জাতিগত নিধন বন্ধের জোরালো দাবি তোলা হয়।
একইসাথে আগস্ট মাসে নতুন করে সহিংসতার ফলে ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হওয়ায় তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। এদের ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।
বিবৃতিতে চীনেরও সম্মতি আদায় করা গেছে। যদিও মিয়ানমার কে নানা বিষয়ে সমর্থন দিয়ে আসা চীন কোনও নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে ভেটো প্রদানের অবস্থান থেকে এখনো সরে আসেনি।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে এছাড়া জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডে মিয়ানমারের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া কাউন্সিলের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিয় গুতেরেসের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, একজন বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য, যিনি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে মহাসচিবের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করবেন।
জাতিসংঘে ব্রিটেনের ডেপুটি অ্যাম্বাসেডর জোনাথন অ্যালেন বলেন, মিয়ানমার এখন কি ধরেনের কি রকম প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটাই তারা পর্যবেক্ষণ করবেন।
চলতি সপ্তাহেই জাতিসংঘ মহাসচিব দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান সম্মেলনে যোগ দেবেন আর সেখানেও আলোচনার প্রধান ইস্যু হিসেবে গুরুত্ব পাবে রোহিঙ্গা ইস্যু।
এদিকে, মিয়ানমারে নির্যাতন হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাবের দাবি তুলেছে মানবাধিকার গ্রুপগুলো।