মিয়ানমারের রাখাইনে সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে রোহিঙ্গা নিপীড়নে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানরা।
লন্ডনে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণায় এ আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, নির্যাতনের মুখে পালিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি কমনওয়েলথ নেতারা সম্পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছে।
কমনওয়েলথ নেতারা জাতিগত নিধন বন্ধ ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে মানবাধিকার লংঘনে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
যৌথ ইশতেহার:
নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশে মানবাধিকার লংঘনকারী অপরাধীদের জবাবদিহি করানো এবং সেখানে সকল সহিংসতা বন্ধ ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে কমনওয়েলথ।
৫৩ জাতির গ্রুপ কমনওয়েলথ শুক্রবার যৌথ ইশতেহারে এ আহ্বান জানায়।
গতকাল বিকেলে সমাপ্ত কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের ২৫তম সম্মেলনে সর্বসম্মতভাবে এ ইশতেহার গৃহীত হয়।
যৌথ ইশতেহারে বলা হয় সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বাস্তুচ্যুত সকল রোহিঙ্গাকে স্থায়ীভাবে ফেরত নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। পাশাপাশি সদস্য দেশগুলো তাদের মর্যাদা সহকারে নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনে প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টিরও আহ্বান জানাচ্ছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করে কমনওয়েলথ নেতৃবৃন্দ দেশের সরকার ও জনগণের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন।
ইশতেহারে বলা হয়, দুঃস্থ মানুষগুলোকে আশ্রয় দেয়ার জন্য কমনওয়েলথ নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করছে। সরকার প্রধানগণ বর্তমান সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা অবিলম্বে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির কথা উল্লেখ করে কমনওয়েলথ নেতৃবৃন্দ রোহিঙ্গাদের স্থায়ী প্রত্যাবাসন শুরু করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তারা মিয়ানমার সমাজে রোহিঙ্গাদের সমমর্যাদা দেয়ারও আহ্বান জানান।
সরকার প্রধানগণ সকল ধরনের চরম পন্থার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের জঙ্গিবাদ বিরোধী কর্ম পরিকল্পনার প্রতি অব্যাহত সমর্থন প্রকাশ করেন।
গত বছরের আগস্টের শেষ দিকে রাখাইনে সেনাবাহিনীর সহিংসতার মুখে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে শুরু করে। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন সময় রাখাইনে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা চার লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ।
এ রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ ভূমিতে ফেরা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা প্রত্যাশা করে মঙ্গলবার লন্ডনে এক সেমনিারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার যাতে দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করে সেজন্য দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও চাপ সৃষ্টি করা উচিত।
রোহিঙ্গা সংকটের অবসানে গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সম্মেলনে তার দেওয়া পাঁচ দফা প্রস্তাবও কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের যৌথ বিবৃতিতে রোহিঙ্গা সঙ্কটের মূল কারণ খুঁজে বের করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কফি আনান নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নেও তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
এবারের কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনে ৫৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ৪৬ জন সরকার প্রধান অংশ নিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এছাড়া নিউজিল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এবারের সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার লন্ডনের উইন্ডসর ক্যাসল ও ল্যানকাস্টার হাউজে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনের বিভিন্ন সেশনে অংশ নেন এবং সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে কমনওয়েলথের উচ্চ পর্যায়ের গ্রুপকে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক করার আহ্বান জানান তিনি। কমনওয়েলথের উচ্চ পর্যায়ের গ্রুপ ‘অর্থায়ন’ ও ‘কর্মকৌশল’ নির্ধারণের দিকে নজর দিতে পারে বলেও মত দেন তিনি।
যোগাযোগ বৃদ্ধি ও সাইবার নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনিয়তাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
শুক্রবার সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারত, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ কয়েকটি দেশের নেতাদের মতবিনিময় হয় বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক।
তিনি বলেন, একটা নতুন কমনওয়েলথ গড়ার অঙ্গীকার নিয়েছেন নেতারা। সবাই খুব আশাবাদী ছিলেন।
‘অভিন্ন ভবিষ্যতের দিকে’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বৃহস্পতিবার বাকিংহাম প্যালেসে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের ২৫তম শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
সাইবার নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে শুক্রবার সরকার প্রধানরা ‘লিডার্স সামিটের’ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন।
উদ্বোধনী দিনের অধিবেশনগুলোতে দেওয়া বক্ততায় সদস্য দেশগুলোর পরিবর্তনশীল চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণে কমনওয়েলথের বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা ও কার্যক্রম পুনর্নির্ধারণ ও পুনর্গঠনের প্রস্তাব করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনে নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনে সংস্থাটির সচিবালয়ের আমূল সংস্কারের উপরও জোর দেন তিনি।
এছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে শেখ হাসিনা জাতিসংঘে যে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন সেটারও পুনরুল্লেখ করেন। এ বিষয়ে কমনওয়েলথের সমর্থন প্রত্যাশার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান তিনি।
সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করে জঙ্গি মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোকে প্রতিরোধে কাজ করতে হবে।
তার সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যপূরণে এগিয়ে চলার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।