হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় বর্ণবাদের প্রতীক দেখালো নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের সন্দেহভাজন বন্দুকধারী ব্রেন্টন ট্যারেন্ট।
গতকাল ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে গুলি চালিয়ে ৩ বাংলাদেশিসহ ৪৯ জনকে হত্যার অভিযোগ অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত ট্যারেন্টকে শনিবার ক্রাইস্টচার্চের ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে হাজির করা হয়।
এ সময় বিচারক তাকে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত আটক রাখতে বলেন।
দুই পুলিশ সদস্য ট্যারেন্টকে আদালতে নিয়ে যায়, এসময় তার গায়ে ছিল বন্দিদের পোশাক, হাতকড়ায় বাঁধা ছিল তার দুই হাত।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, হাতকড়ার মধ্যে আঙুল দিয়ে ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের’ বর্ণবাদী প্রতীক দেখাচ্ছিল ট্যারেন্ট।
মানুষের মধ্যে শেতাঙ্গরা শ্রেষ্ঠ- এটা যারা মনে করেন, তারা আঙুলের মাধ্যমে বিশেষ চিহ্ন তৈরি করে প্রতীক হিসেবে তার প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে।
এক্ষেত্রে বৃদ্ধা ও তর্জনি আঙুল বৃত্তাকারে একসঙ্গে যুক্ত করলে তা ‘P’ এর আকৃতি নেয়, যা দিয়ে Power বা শক্তি বোঝানো হয়। আর বাকি তিনটি আঙুল তখন ‘W’ এর রূপ নেয়, যা দিয়ে বোঝানো হয় White বা সাদা।
২৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় ট্যারেন্টও বন্দি হওয়ার পরও তার বর্ণবাদী মনোভাব এভাবেই তুলে ধরেন।
হত্যাযজ্ঞের পুরো ঘটনা ফেইসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করেন ট্যারেন্টন, ইন্টারনেটে ছড়িয়েছে বর্ণবাদী, অভিবাসী বিদ্বেষী, উগ্র ডানপন্থি বার্তা।
গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলা চালানোর আগে ট্যারেন্ট তার টুইটার অ্যাকাউন্টে ৭৩ পৃষ্ঠার একটি কথিত ‘ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশ করে। সেখানে সে নিজেকে বর্ণনা করেছে ভাষায়, সংস্কৃতিতে, রাজনৈতিক বিশ্বাস আর দর্শনে, আত্মপরিচয়ে এবং বংশপরিচয়ে একজন ইউরোপীয় হিসেবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ট্যারেন্ট জানিয়েছে, তার তথাকথিত ‘ম্যানিফেস্টোতে’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এদিকে,তবে হোয়াইট হাউজ ক্রাইস্টচার্চের ওই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে, ট্রাম্প নিজেও টুইট করে হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন।
হামলার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে নিজের অভিবাসনবিরোধী ও মুসলিমবিরোধী অবস্থানের কথা তুলে ধরেছে ট্যারেন্ট। এক জায়গায় তিনি নিজেকে ‘এথনোন্যাশনালিস্ট এবং ফ্যাসিস্ট’ হিসেবেও বর্ণনা করেছে।
গার্ডিয়ান লিখেছে, ব্রেন্টন ট্যারেন্ট ম্যানিফোস্টোতে নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়েছেন নরওয়ের কুখ্যাত খুনি অ্যান্ডার্স বেরিং ব্রেইভিকের কথা বলেছেন।
২০১১ সালের জুলাই মাসে অসলোতে বোমা বিস্ফোরণ এবং উটোয়া দ্বীপে গুলি চালিয়ে ৭৭ জনকে হত্যা করে। ওই অপরাধে আদালত তাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ নাম দিয়ে ওই ম্যানিফোস্টোতে বলা হয়েছে, দুই বছর ধরে তিনি ওই হামলার পরিকল্পনা করছিল। এ হামলার জন্য নিউজিল্যান্ড তার প্রথম পছন্দ ছিল না। তবে পরিকল্পনায় নির্ধারিত সময়ের তিন মাস আগেই সে ক্রাইস্টচার্চকে হামলার জন্য বেছে নেয়।
হামলার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করলে বাড়তি প্রচার পাওয়া যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র তথা রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়বে এমন ভাবনা থেকেই অটোমেটিক রাইফেল ব্যবহারের সিদ্ধান্তের কথা সেখানে লিখেছে ট্যারেন্ট।
লাইভ ভিডিওতে দেখা গেছে, সেসব অস্ত্র ও ম্যাগাজিনের ওপর সাদা রঙে বেশ কিছু নাম লিখেছে ট্যারেন্ট। ব্রিটেনের ডেইলি মিরর ওই নামগুলো বিশ্লেষণ করে হামলাকারীর উদ্দেশ্য ও বক্তব্য বোঝার চেষ্টো করেছে।
একটি ম্যাগাজিনের ওপর লেখা ছিল রদারহ্যাম, আলেসান্দ্রে বিসনেত্তা ও লুকা ত্রাইনির জন্য।
আলেসান্দ্রে বিসনেত্তা ২০১৭ সালে কানাডায় একটি মসজিদে হামলা চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করে। গত ফেব্রুয়ারিতে তার যাবজ্জীবন সাজার রায় হয়।
আর উগ্র ডানপন্থি ইটালীয় নাগরিক লুকা ত্রাইনি ২০১৮ সালে মাসেরাতা শহরে গুলি চালিয়ে আফ্রিকা থেকে আসা ছয় অভিবাসীকে হত্যা করেন। তার ঘরে পাওয়া গিয়েছিল হিটলারের লেখা মেইন ক্যাম্ফ।