ইরাক এবং সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়েই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল ইসলামিক স্টেট (আইএস)। গত কয়েক বছর এভাবেই জায়গা বদল করে পালিয়ে ছিল আই এস প্রধান। সপরিবারে পালিয়েও শেষমেষ লাভ হল না।
বিষয়টি আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ পর্যবেক্ষণ করছিলো বেশ ভালোভাবেই। গেল কয়েক মাস ধরে ‘জিপিএস লোকেশন ট্র্যাক’ করে ধারাবাহিক নজরদারি, নিখুঁত পরিকল্পনা এবং চূড়ান্ত অপারেশনের আগে বারবার মহড়া দেয় তারা।
অবশেষে সফল হয় তারা। বুধবার মধ্যরাতে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার অটমে শহরে আমেরিকার সেনা অভিযানে আইএসপ্রধান আবু ইব্রাহিম অল-হাশিমি অল-কুরেশির মৃত্যু হয়। ঘটনাকে সেই ‘প্রস্তুতির সাফল্য’ বলেই দাবি করেছে পেন্টাগন।
অটমের সিন্ডার ব্লক আবাসন থেকে ছ’হাজার মাইল দূরে ওয়াশিংটনের ‘সিচুয়েশন রুমে’ বসে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেনা অভিযানের ‘লাইভ’ দেখেছেন বলে সরকারি সূত্র বলছে। বাইডেনের পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পও ২০১৯-এর অক্টোবরে একইভাবে তৎকালীন আইএসপ্রধান আবু বকর আল বাগদাদির মৃত্যু সরাসরি দেখেছিলেন। ঘটনাচক্রে, কুরেশিও তার পূর্বসূরি বাগদাদির মতোই মার্কিন সেনার হাতে ধরা না দিয়ে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিজেকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাতে মৃত্যু হয়েছে, তার স্ত্রী, সন্তান, পরিজনসহ অন্তত ১৩ জনের।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত তিন বছর ধরে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে কুরেশির আশপাশে ঘুরছিলেন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএর এজেন্টরা। ওই এলাকায় মোতায়েন ন্যাটো ফৌজের জেনারেল ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকেঞ্জি ধারাবাহিকভাবে প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর অবশেষে সাফলতার দেখা পেলেন তারা।
বাগদাদির জামানায় আইএসের মূল নীতিনির্ধারক ছিলেন কুরেশি। মূলত, ইরাক এবং সিরিয়ায় দখল করা এলাকায় তেলের খনি থেকে ‘রাজস্ব’ আদায়ের বিষয়টিও তিনি দেখভাল করতেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে লাগাতার অভিযানে ইরাক এবং সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়েই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল আইএস। ক্রমশ জায়গা বদলে সপরিবারে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন কুরেশি। তার শেষ ঠিকানা হয় তুরস্ক সীমান্ত লাগোয়া অটমে শহরের সিন্ডার ব্লক আবাসন। বেশ কয়েকদিন ধরেই তার গতিবিধির ওপরে নজর রাখছিলেন আমেরিকার গোয়েন্দারা। হোয়াইট হাউসের সবুজ সংকেত পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলো তারা। অনুমতির পরেই শুরু হয় হেলিকপ্টারে চূড়ান্ত অভিযানের প্রস্তুতি।
প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল, আইএসপ্রধানকে জীবন্ত গ্রেফতার করা। কিন্তু বাগদাদিকাণ্ডের অভিজ্ঞতার কারণে ‘বিকল্প পথ’ও খোলা রাখা হয়েছিল। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক নারী জানাচ্ছেন, হেলিকপ্টার সওয়ার আমেরিকা সেনা সিন্ডার ব্লক আবাসন ঘিরে ফেলার পর লাউডস্পিকারে কুরেশি এবং তার সঙ্গীদের আত্মসমর্পণ করতে বলে। কিন্তু তাতে সাড়া না দিয়ে ‘শেষ যুদ্ধ’ শুরু করেন তিনি।
পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা আইএসপ্রধানের ঠিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলাম। ড্রোন হামলায় তাকে শেষ করার প্রাথমিক পরিকল্পনাও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই আবাসনে বসবাসকারী নারী, শিশু এবং অন্য বেসামরিক নাগরিকদের কথা ভেবে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২০১১ সালে ৯/১১ হামলার মূলচক্রী আল কায়দাপ্রধান ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে খতম করে মার্কিন নেভি সিল। সে সময় মার্কিন ক্ষমতায় ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ১১ বছরের মাথায় আরেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টের হাত ধরে এল সন্ত্রাস দমনের নতুন সাফল্য।
সূত্র: আনন্দবাজার।