টানা ৬ দিন চলা যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করছে ইউক্রেন। তবে তাদের এই প্রতিরোধ যুদ্ধে শক্ত ভুমিকা রেখে আলোচনায় এসেছে তুরস্কের বায়রাখতার টিবি-২ ড্রোন। তুর্কী প্রযুক্তিতে তৈরি ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিকলা ওলেশচুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুরস্কের এই অস্ত্রের প্রশংসা করেছেন। সেখানে তিনি বলেন, বায়রাখতার টিবি২ ড্রোন ‘জীবন দানকারী’। ড্রোনটি ভ্রাম্যমাণ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে রুশ সেনাদের উপর হামলা চালিয়ে সমরাস্ত্র বিশারদদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ইউক্রেনীয় এক দূতাবাসের টুইটারে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা গেছে, একাধিক গাড়ি বহন করা রাশিয়ার কনভয়ে ড্রোন হামলা করে উড়িয়ে দিয়েছে ইউক্রেনের সেনারা। হামলাকারী এ ড্রোনগুলো তুরস্কের প্রযুক্তিতে তৈরি বায়রাখতার টিবি-২ বলে জানিয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিকলা ওলেশচুক। এর বাইরেও ইউক্রেনে তুরস্কের তৈরি ড্রোনের গুপ্ত হামলা সামাল দিতে রুশ সেনাদের বেগ পেতে হচ্ছে বলে দাবি পর্যবেক্ষকদের।
রণক্ষেত্রে বায়রাখতার টিবি-২ ড্রোনের এমন কার্যকারীতা এর আগেও দেখা গেছে। সিরিয়া, লিবিয়া ও নগর্ন-কারাবাখে খণ্ড খণ্ড কিছু অভিযানে সাফল্য দেখিয়েছিল বায়রাখতার ড্রোন। তবে কোনো উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন পেশাদার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে পূর্ণ যুদ্ধে ড্রোনটি কতটুকু সফল হতে পারবে—এ নিয়ে সংশয় ছিল অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের। এবার ইউক্রেন যুদ্ধ বায়রাখতার ড্রোনের সামর্থ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে হয়ে এলো।
তুরস্কের প্রযুক্তিতে তৈরি এ ড্রোনের অন্যতম প্রধান গ্রাহক ইউক্রেন। ইউক্রেন ও তুরস্ক বরাবরই প্রতিরক্ষা শিল্পে ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বিকশিত হয়েছে। যুদ্ধের আগেই ইউক্রেনে বায়রাখতার টিবি-২ ড্রোন তৈরির একটি কারখানা নির্মাণ করে ড্রোনটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এর আগে তুরস্কর কাছ থেকে এ ড্রোন কিনেছিল ইউক্রেন। ২০১৯ সালে তুরস্কের তৈরি এসব ড্রোনের প্রথম চালান ইউক্রেনে পৌঁছায়। টিবি-২ ড্রোনের ইঞ্জিন ইউক্রেনের কয়েকটি কোম্পানিও তৈরি করে থাকে। এর বাইরে তুরস্ক গত দুই বছর ২০টির বেশি টিবি-২ ড্রোন ইউক্রেনে সরবরাহ করেছে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইউক্রেনের অস্ত্রাগারে যথেষ্ট পরিমাণ টিবি-২ ড্রোন রয়েছে।
মিডিলইস্টআই-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের আগে তুর্কি ড্রোনগুলো রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে বলে আত্মবিশ্বাস ছিল সামরিক কর্মকর্তাদের। তারা সিরিয়া, নাগর্নো-কারাবাখ এবং লিবিয়াতে রাশিয়ার তৈরি বিভিন্ন অস্ত্র ধ্বংসের রেকর্ড দেখে ড্রোনটির উপর আস্থা রাখেন। বিশেষত, রাশিয়ার পান্তশির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুর্কি ড্রোন মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ার কারণে এটি এখন সেনাদের কাছে উপহাসের বস্তু হয়ে উঠেছে।
বহু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ ক্রেমলিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে না। শুরুতে ইউক্রেনের বিমানবাহিনী (ড্রোনসহ) ধ্বংস না করে পদাতিক সেনাদের দেশটির অভ্যন্তরে পাঠানো মস্কোর একটি ভুল রণকৌশল ছিল। এর ফলে এখন ইউক্রেনের আকাশসীমার উপর একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারছে না রাশিয়া।
ইস্তাম্বুলভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইডিএএম-এর প্রতিরক্ষা পরিচালক ক্যান কাসাপোগ্লু মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘কিছু অঞ্চলের উপর রুশ অ্যারো-স্পেস বাহিনীর আধিপত্য রয়েছে, তবে গোটা ইউক্রেনের আকাশসীমায় রাশিয়া সত্যিকারের আধিপত্য কায়েম করতে পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘রাশিয়ান সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের বহু বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ করেছে, তবে এতেও বিমানঘাঁটিগুলোর অপারেশনাল রানওয়ে এবং অন্যান্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।’
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো রবার্ট লি বলেন, ‘যুদ্ধের শুরুতে ভূমি এবং এয়ারফিল্ডে টিবি-২ ড্রোনগুলো ধ্বংস করার ক্ষমতা ছিল রাশিয়ার, কিন্তু কিছু কারণে তা করতে ব্যর্থ হয়েছিল তারা। এছাড়া, এটাও মনে হচ্ছে যে, রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থল বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগে টিবি-২ এর বিরুদ্ধে তাদের নিরাপত্তা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুতি নেয়নি। এটি কেন হলো তা পরিষ্কার নয়।’
এখন অবধি কেবলমাত্র একটি টিবি-২ ড্রোন ধ্বংসের তথ্য নিশ্চিত করেছেন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা। তবে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা গত রোববার তিনটি টিবি-২ ড্রোনে গুলি করেছে।
ইডিএএম-এর প্রতিরক্ষা পরিচালক ক্যান কাসাপোগ্লু এ ব্যাপারে আরও বলেন, ‘তুর্কি ড্রোন সম্পর্কে সিরিয়া, লিবিয়া এবং কারাবাখ থেকে পাওয়া শিক্ষা ইতিমধ্যেই সোভিয়েত-রাশিয়ান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কাজে লেগেছে। বিশেষ করে যখন তাদের (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) নেটওয়ার্ক সেন্সর ক্ষমতা হ্রাস পায় তখন ড্রোনগুলো খুব কার্যকর হয়ে উঠে।’
টিবি-২ ড্রোনের নেটওয়ার্ক সিস্টেম অচল করে দিতে রাশিয়ানদের ব্যর্থতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, তুরস্কের ড্রোনগুলোর ডাটালিঙ্ক কমপ্লেক্স রুশ ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক জ্যামিং সিস্টেমের নিচে অবস্থান করছে। ফলে ড্রোনগুলোকে মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তবে টিবি-২ ড্রোনগুলো শেষ পর্যন্ত রণক্ষেত্রে সমান অবদান রেখে যেতে পারবে কি না তা এখনও দেখা বাকি বলে উল্লেখ করেন এই বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘যদিও এখনও দেখা বাকি যে, ড্রোনগুলো আরও সফল হামলা চালাতে সক্ষম হবে কি না— নাকি রাশিয়ার মোবাইল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ড্রোনগুলোর গতিবিধির প্যাটার্ন ধরে ফেলতে সক্ষম হয়ে উঠবে।’
কাসাপোগ্লু কিয়েভের উপকণ্ঠে একটি চেচেন যোদ্ধা দলের উপর টিবি-২ ড্রোনের হামলার ঘটনা উল্লেখ করে এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, চেচেন যোদ্ধারা রণক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এবং দুর্ধর্ষ বলে পরিচিত। তাদের বিরুদ্ধে ড্রোনগুলোর কার্যকারিতা কৌশলগত দিক থেকে ইউক্রেনকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে তুরস্কের ড্রোনগুলোর ভূমিকার সারাংশ হিসেবে এই তুর্কি বিশ্লেষক বলেন, ‘কারাবাখে ড্রোন ছিল যুদ্ধের ভাগ্যনিয়ন্তা। আর ইউক্রেনে এটি একটি কৌশলগত ইউনিট হিসেবে কাজ করছে—যা প্রতিপক্ষের অন্যান্য ক্ষতির পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেও অবদান রাখছে।