অপহরণের পর আমাকে যে বাসায় রাখা হয়েছিল তার পাশে মসজিদ ছিল আর আযানের ধ্বনি শুনে তাদের জিজ্ঞেস করে সময় যেনে নেই বলে জানান আবু বকর সিদ্দিক। শুক্রবার রাজধানীর ধানমণ্ডির সেন্ট্রাল রোডে বাসভবনে সাংবাদিকদের কাছে এভাবেই অপহরণের ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। এসময় তার পাশে ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী তার স্ত্রী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
বুধবার দুপুর ২টা, ফতুল্লার আবু বকরের অফিস (হামিদ ফ্যাশন) থেকে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে পোস্ট অফিস থেকে শিবু মার্কেট পর্যন্ত কুতুবআইল সড়ক দিয়ে বের হয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোডে উঠেন তিনি। তার লাল রঙের প্রাইভেটকারটি লিঙ্ক রোডের ভূঁইগড়ের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে একটি নীল রঙের হাইয়েস মাইক্রোবাস গাড়িটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়।
এ সময় তিনি ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললে পেছনে নীল রঙের মাইক্রোবাসটিও থামে। মাইক্রোবাস থেকে ৫-৬ জন নেমে আসে। তিনি গাড়ি থেকে নেমে ধাক্কা দেয়ার কারণ জানতে মাইক্রোবাসের দিকে অগ্রসর হন। তখন মাইক্রোবাস থেকে ২ জন নেমে চালকের চোখে কিছু একটা ছিটিয়ে দিয়ে তাকে গাড়িতে তুলে নেয়।
গাড়িতে উঠিয়ে তার হাত-পা, মুখ ও চোখ বেঁধে তাকে একটি বাসায় নিয়ে যায়। তখনও তার চোখ খোলা হয়নি। সেখানে রাত ১০টায় ‘বড় ভাই’ পরিচয়ে একজন লোক এসে তাকে নানা কথা জিজ্ঞেস করেন। কোথায় চাকরি করেন এবং কত টাকা বেতন পান তাও জানতে চান।
‘বড় ভাই’ পরিচয়ে ওই লোক বলেন, মিডিয়াতে তার নামে এতো প্রচার হচ্ছে কেন? তিনি কি বিখ্যাত ব্যক্তি হয়ে গেছে কিনা জানতে চায়।
বুধবার রাত ও বৃহস্পতিবার পুরো সময় ওই বাসায় তার চোখ বাঁধে রাখা হয়। শুধু টয়লেটে যাওয়ার সময় চোখ খুলে দেয়া হতো। চোখ বাঁধা থাকার কারণে ওই বাসার পরিবেশ কেমন তা দেখা যায়নি। তবে টয়লেটের পরিবেশ খুব নোংরা ছিল।
অপহরণকারীরা তাকে কোনো ধরনের নির্যাতন করেনি। একজন সময় মতো তাকে খাবার দিয়ে যেত। তারা আবু বকরের সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি বলেও জানান তিনি।
তাকে নিয়ে বাইরে কি হচ্ছে কিংবা মিডিয়ায় যে এতো প্রচার হচ্ছে তা ওই বাসায় বসে তিনি বুঝতে পারেননি।
বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ‘বড় ভাই’ পরিচয়ে ওই লোক আবার বাসায় এসে বলেন, আবু বকরকে ছেড়ে দিলেও তাদের লস, মের ফেললেও লস, তাই তাকে ছেড়েই দেয়া ভালো।
তখন তাকে একটি গাড়িতে করে মিরপুর আনসার ক্যাম্পের সামনে এনে ছেড়ে দেয় তারা। যাওয়ার সময় আবু বকরের হাতে ৩০০ টাকাও দিয়ে যায় তারা। গাড়ি থেকে নেমে নিজেই নিজের চোখ খুলেন এরপর একটি রিকশায় করে কাজীপাড়া তারপর পথে আরেকটি সিএনজি নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওয়ান দেন।
পথে রাত দেড়টার দিকে কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে বসানো চেকপোস্টে পুলিশ সিএনজি থামিয়ে পরিচয় জানতে চায়লে পরিচয় দেয়ার পর তাকে ধানমণ্ডি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, বুধবার দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোডে ভূঁইয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা।
অপহরণের ঘটনার পর থেকেই রাজধানীর আশপাশ এলাকার বিভিন্ন সড়কে বসানো হয় অতিরিক্ত চেকপোস্ট। চলে ব্যাপক অভিযান।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যা ব) একাধিক দল ঘটনার পরপরই ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ ছুটে যায়। বুধবার বিকেল থেকেই অনেক এলাকায় শুরু হয় অভিযান।
পুলিশের পক্ষ থেকে দেশের সব থানা, সীমান্ত এলাকা, নৌ ও বিমানবন্দরে সতর্ক বার্তা পাঠানো হয়। মাঠ পর্যায়ে তল্লাশির পাশাপাশি প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও চলে অনুসন্ধান। বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে মিরপুরের আনসার ক্যাম্পের সামনে অপহরণকারী তাকে ফেলে রেখে যায়।