বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী দেশের প্রধান খাত পোশাক শিল্পের জন্য বিপর্যয়কর ও বিভীষিকাময় দিন ২৪ এপ্রিল। এক বছর আগে এ দিনে সাভারে ৯তলা রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়লে মারা যান পাঁচ গার্মেন্টসের ১১৩৫ জন শ্রমিক। আহত ১ হাজার ১৬৭ জনের মধ্যে অনেকেই সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন।
অজ্ঞাত পরিচয়ে দাফন হয়েছেন দুই শতাধিক শ্রমিক। এতিম কয়েকশ শিশু-কিশোর। ভবনমালিক সোহেল রানা ও কতিপয় গার্মেন্টস মালিকের অদূরদর্শিতার বলি হয় বিশ্বময় সুনাম কুড়ানো রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প। তবে বছর ঘুরলেও হতাহতদের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান; কারখানার কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের জীবনমান নিশ্চিত এবং জড়িতদের বিচার ও শাস্তি—এর সবকিছুই এখনো অপরিণত।
জীবন থেমে থাকে না, জীবিকা সেই জীবনকে টেনে নিয়ে যায়। অন্তহীন ছুটে চলাতেই ঘোরে জীবনের চাকা। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল তেমনি একটি দিন ছিল আরো লক্ষ-হাজারোর মতো এ শ্রমজীবীদেরও। তবে লাশ হয়ে তারা জানান দিলো শ্রমঘন সেই তৈরি পোশাক শিল্পে কতো আচমকা বিপর্যয় তাদেরকে মুহূর্তেই নিস্তব্ধ করে দেয়।
বিকট শব্দে ধসে পড়ে সেই বিভীষিকার ইতিহাসই তৈরি করলো সাভারের ৯তলা রানা প্লাজা ভবনের ধ্বংসস্তূপ। আর্ত চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। শোকবিহ্বল করে তোলে সারাদেশকে।
সাহায্যের হাত বাড়ায় শত শত সাধারণ মানুষ। উদ্ধার কাজে নামে দমকল বাহিনী, রেডক্রিসেন্ট ও স্কাউট সদস্যরা। যোগ দেন সেনাবাহিনীর সদস্যরাও। সমন্বিতভাবে চলে উদ্ধার তৎপরতা। জীবিত উদ্ধারের পাশাপাশি বাড়তে থাকে আহতের সংখ্যা। বড় হতে থাকে লাশের মিছিল। স্কুল মাঠে লাশের সারি থেকে স্বজনদের শনাক্ত করতে থাকে শত শত মানুষ। অনেকে ছুটতে থাকেন হাসপাতালে, আহতের তালিকায় যদি পাওয়া প্রিয় মানুষটির নাম।
অথচ ভবনটিতে ফাটল দেখা দেয়ায় এ গার্মেন্ট চালু থাকারই কথা ছিল না কিন্তু মুনাফার লোভে পরাজিত হয় মানবিকতা। ভবনমালিক ও গার্মেন্ট মালিক শ্রমিকদের কাজে অংশ নিতে বাধ্য করে। আর ৫টি কারখানার জেনারেটরের কম্পনেই ঘটে এ বিপর্যয়। অবহেলাজনিত হত্যার শিকার হন সহস্রাধিক শ্রমিক।
এ ভবন ধস শুধু ট্র্যাজেডির উদাহরণ নয়, মানবিকতারও অনন্য নিদর্শন তৈরি করেছে। শাহিনাকে দেবে যাওয়া ভবনের ৫তলায় জীবিত অবস্থায় দমকল বাহিনীর এক সদস্য দেখতে পাওয়ার পর, তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চলে। কিন্তু উদ্ধারকর্মীরা জীবন বিপন্ন করেও সাহিনাকে আর জীবিত উদ্ধার করতে পারেননি।
আবার এর বিপরীতে ১৯ দিন পর বিস্ময়করভাবে উদ্ধারকর্মীরা জীবিতই উদ্ধার করে রেশমাকে আর তৈরি হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টান্ত।
তবে নাম পরিচয়হীন অবস্থায় দাফন হওয়া ২৯১ জনের মধ্যে ডিএনএ টেষ্টের মাধ্যমে ২০৬ জনকে স্বজনেরা শানক্ত করতে পারে। এখনো শনাক্তহীন রয়েছে ৮৫ জন।
এদিকে, ভবনমালিক সোহেল রানাসহ ৫ গার্মেন্ট মালিক, ৩ প্রকৌশলীকে গ্রেপ্তার করার পর রানা ছাড়া সবাই এখন জামিনে। ৫টি তদন্ত কমিটিই তাদের রিপোর্টে একে অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রতিবেদন দেয়।দুদক খুঁজে বেড়াচ্ছে ভবন মালিক সোহেল রানার অবৈধ সম্পদ। কিন্তু কোনো প্রক্রিয়াই শেষ হয়নি।
বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলায় যুক্তরাষ্ট্র কর্ম পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শর্ত দিয়ে স্থগিত করে অগ্রাধীকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি)। সরকার, গার্মেন্টস মালিক ও বিদেশি ক্রেতারা নিহতের স্বজনদের ক্ষতিপুরণ ও পূর্নবাসেনর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসবও প্রক্রিয়াধীন, হয়নি স্থায়ী আবাসন, কর্মসংস্থান ও স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণও।
আর নিহতের স্বজনেরা এখনো প্রতীক্ষার প্রহর গোনেন যাদের অবহেলা আর দায়িত্বহীনতায় এতগুলো প্রাণ ঝড়ে গেলো, তাদের যথাযথ বিচার হবে তো?