সাংবাদিক ও সাবেক সংসদ সদস্য এন মাহফুজা খাতুন বেবী মওদুদ আর নেই। বেশ কিছুদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগে শুক্রবার রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা যান তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর।
বেবী মওদুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, সৎ, সাহসী ও অসম্ভব স্নেহময়ী একজন মানুষ ছিলেন তিনি।
তার জীবন সম্পর্কে কিছু কথা:
লেখক ও সাংবাদিক। জন্মগ্রহণ করেন ২৩ জুন ১৯৪৮ সালে। বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় বহু দৈনিক পত্রিকায় তিনি কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে জড়িত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্সসহ এমএ করেছেন। কিশোরদের জন্য প্রচুর লেখালেখি করেছেন। শিশুসাহিত্যিক হিসেবেই তার খ্যাতি সবচেয়ে বেশি। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিডি নিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকম-এর সোস্যাল অ্যাফেয়ার সম্পাদক।
মানুষের জন্য কথা বলা যখন জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে যায়, তখন আমরা তাকে বলি আলোর দিশারী। সেটা যেভাবেই হোক; হোক সেটা কলম যুদ্ধের মধ্যদিয়ে। কিংবা সংসদে দাঁড়িয়ে দেশের সাধারণ মানুষের কথা বলে, তাদের প্রতিনিধিত্ব করার মাধ্যমে।
শতভাগ সততায় মোড়া একটি জীবনে যদি কলম যুদ্ধের কথা বলা হয়, তাহলে তিনি সাংবাদিকতায় এক কিংবদন্তি। আবার একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে, মানুষের অধিকারের কথা বলার জন্য একজন প্রতিনিধি হিসেবে প্রতি মুহূর্তে সরব কণ্ঠস্বর তার। হ্যাঁ, তাকে আমরা বেবী মওদুদ নামেই চিনি।
দিনটি ছিলো ’৪৮ সালের ২৩ জুন। বিচারপতি আবদুল মওদুদ এবং হেদায়েতুন নেসার ঘর আলোকিত করে জন্ম নেন আজকের বেবী মওদুদ। বাবা-মা নাম রাখেন আ. না. মাহফুজা খাতুন। কিন্তু কর্মজীবনে তিনি বেবী মওদুদ নামেই সুপরিচিত।
নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী তাই আমার শৈশব-কৈশর কেটেছে বগুড়া, ফরিদপুর, রাওয়ালপিন্ডিতে। তবে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে। এরপর বাবার হাত ধরেই আমরা ’৬৭ সালে ঢাকায় আসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ’৭০ সালে বাংলা সাহিত্যে বি. এ. অনার্স এবং ’৭১ এম. এ. পাস করি।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে বেবী মওদুদ এক জীবন্ত ইতিহাস। লেখালেখির অভ্যেসটা ছিলো ছোটকাল থেকেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাংবাদিক হবেন এমনটি হয়তো প্রথমদিকে ভাবা হয়নি তার। কিন্তু মানুষের কাছে যাওয়ার তীব্র আকাক্ষা, মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছাই এগিয়ে নিয়েছে তার কলমের অগ্রযাত্রাকে।
আইন প্রণেতা বেবী মওদুদ:
নিজের দীর্ঘ সাংবাদিক জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্মৃতির পাতা হাতড়ে উঠে আসে অনেক কিছুই। তিনি বলেন, আমাদের বাসায় অনেক পত্র-পত্রিকা রাখা হতো। সে কারণে ছোটবেলা থেকেই পত্র-পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছিলো। স্কুলে জীবন থেকেই ছিলো লেখালেখির অভ্যাস। তবে কলেজ জীবনে আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়। সে সময় ইত্তেফাক, সংবাদ, পূর্বদেশ, চিত্রালীসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সাংস্কৃতিক সংবাদগুলো ছাপা হতো। সাংবাদিক হবো, এ বিষয়টি অনেক পরে মাথায় এসেছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। তখন সাপ্তাহিক ‘ললনা’ নামে একটি পত্রিকায় আমি প্রথম স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করি। ইন্টারভিউয়ের জন্য আলাদা একটি পাতা ছিলো। সেখানে নিয়মিত লিখতাম। আজ যারা অনেক বিখ্যাত, তাদের অনেকেরই প্রথম ইন্টারভিউ আমি নিয়েছি। বিশেষ করে শেখ হাসিনা, সাবিনা ইয়াসমিনসহ অনেকের।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সাপ্তাহিক রানার নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলাম। যার সম্পাদক ছিলাম আমি। ’৭১-এর ২৫শে মার্চ কালো রাতের আগ পর্যন্ত পত্রিকাটি বের করতে পেরেছিলাম। কিন্তু প্রেস পুড়িয়ে দেয়ায় পরে পত্রিকাটি আর ছাপানো সম্ভব হয়নি।
শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নিজেকে আবিষ্কার করেন একজন স্বাধীনতাকামী মানুষ হিসেবে। কবি সুফিয়া কামালের নেত্রীত্বে নেপথ্যে থেকে করেছেন অনেক কাজ। মহিলাদের সাথে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তৈরি করে দিয়েছেন সোয়েটার। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন। এত কিছুর মাঝেও তার কলম থেমে থাকেনি এতটুকুও।
দেশ স্বাধীনের পর আবারো পুরোদমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। সে সময় দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজাদ, দৈনিক গণবাংলাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা শুরু করেন।
এ সম্পর্কে তিনি বলেন, দৈনিক পত্রিকা হিসেবে দৈনিক সংবাদে আমি প্রথম স্টাফ হিসেবে কাজ শুরু করি। পরবর্তিতে দীর্ঘদিন সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেছি। বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছি। দৈনিক ইত্তেফাকের মহিলা পাতাটিও আমিই দেখতাম। এরপর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা যখন প্রথমবারের মতো চালু হয়, তখন সেখানে আমি প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দিই।
শুধু নিজের লেখনির মাঝেই নয়, তিনি দেশের সাধারণ মানুষের কথা বলে যাচ্ছেন একজন সাংসদ, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে। একজন সাংসদ হিসেবে কেমন লাগছে? অথবা একজন সাংসদ হিসেবে যেভাবে কাজ করবেন চিন্তা করেছিলেন, সেভাবে পারছেন কিনা? এমন এক প্রশ্নের জবাবে এই আইন প্রণেতা বলেন, সংসদ সদস্য হবো এমন স্বপ্ন আমার ছিলো না। ছাত্র রাজনীতি করার সময় স্বপ্ন দেখতাম মানুষের জন্য কাজ করবো। তাদের কাছাকাছি যাবো। যেগুলো আমি সাংবাদিকতায় করেছি। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি যেভাবে মানুষের সাথে কাজ করেছি, সেটা থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি এখনও। হ্যাঁ, আমি দেখেছি পাকিস্তানের সংসদ। এখন দেখছি বাংলাদেশের সংসদ। যখন সংসদের নিউজ কভার করতাম তখন আমার মনে হয়েছে, অনেক বিষয় সংসদে উত্থাপন হয় না। সে বিষয়গুলো মাথায় থাকার কারণে সাংসদ হিসেবে কাজ করতে কোনো সমস্যা হয় না। আমি চেষ্টা করি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার, সংসদে দাঁড়িয়ে তাদের পক্ষে কথা বলার।
ক্ষমতার আগে কিংবা পরে, সারাজীবন একইভাবে কাটালেন। একেবারেই সাদামাটা, নির্ভেজাল। শতভাগ সততার চাদরে মোড়া এমন একটা জীবনযাপন করায় কার অনুপ্রেরণা কাজ করেছে এমন প্রশ্নের জবাবে বেবী মওদুদ বলেন, সততা কি, তা আমি বুঝি না। আমি শুধু চেষ্টা করেছি একজন ভালো মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে। ক্ষমতা এক আর জীবনটা আরেক জিনিস। এই ক্ষমতাটা কেন, সেটা ভালো মতো জানা থাকলে তো আমি নীতি বিবর্জিত হতে পারি না। এ ধরনের জীবনযাপন আমার শৈশব থেকেই। একটা জামা প্রয়োজন? সেটা বলতেও লজ্জা পেতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক জোড়া করে স্যান্ডেল পরতাম। ছিঁড়ে গেলে সেলাই করে নিতাম। যখন দেখতাম একেবারেই পরা যাচ্ছে না, তখন আরেক জোড়া পরতাম। অপচয় এবং অপব্যবহার শব্দগুলো আমাদের শিক্ষায় ছিলো না। সেদিন বলেছিলেন সাক্ষাতকারে।