মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত জয়পুরহাটের শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান, বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল আলীম মারা গেছেন। শনিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
হাসপাতালে আবদুল আলীমের বড় ছেলে ফয়সাল আলীম সাংবাদিকদের বলেন, কারা ও হাসপাতালের নিয়মকানুন শেষে প্রথমে তাকে রাজধানীর বনানী জামে মসজিদে জানাজা দেয়া হবে। পরে রোববার জয়পুরহাটে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবর স্থানে দাফন করা হবে।
বেলা ১.৩০ দিকে মারা যান তিনি বলে জানান ফয়সাল আলীম।
তার বিচার নিয়ে কিছু কথা:
গতবছর ৯ অক্টোবর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করে।
ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মুজিবুর রহমান মিয়া পড়েছেন ৫৭ থেকে ১০৫তম প্যারা। ১০৬ থেকে ১৩৭তম প্যারা পড়ে ট্রাইব্যুনাল প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান আব্দুল আলীমের আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা ঘোষণা করেন।
১৭টি অভিযোগের মধ্যে ৯টি প্রমাণিত হয়। ৬টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি ও ২টি অভিযোগেরর পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো সাক্ষী জোগার করতে পারেনি।
৪টি অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড, ৪টিতে ২০ বছর করে কারাদণ্ড এবং একটিতে ১০ বছর কারাদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়।
আলীমের বিরুদ্ধে জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে মেহের উদ্দীন চৌধুরীর বাড়িতে হামলা, দেশান্তরে বাধ্য করা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের প্রথম অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
কড়াইকাদিপুরে লুট, অগ্নিসংযোগের পর ৩৭০ জন হিন্দু বাসিন্দাকে হত্যার দ্বিতীয় অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। কোকতারা গ্রামে ৯ জনকে হত্যার ৬ নম্বর অভিযোগও প্রমাণিত।
আলীমের নির্দেশে নওদা গ্রামে চারজনকে হত্যার ৭ নম্বর এবং উত্তরহাট শহর, হারুনজাহাটে হিন্দু সম্প্রদায়ের দশজনকে হত্যার ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত।
পশ্চিম আমাত্রা গ্রামে ১৫ যুবককে নির্যাতনের পর হত্যার ৯ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত। মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে জয়পুরহাট কলেজে ২৬ জনকে হত্যার ১০ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
এছাড়া দেবীপুর কাজীপাড়ায় আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাশেমকে হত্যার ১২ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। পাহাড়পুরে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল করিমসহ ২ জনকে হত্যার ১৪ নম্বর অভিযোগও প্রমাণিত।
এদিকে, ৩, ১১ ও ১৩, ১৫, ১৬, ১৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আর ৪ ও ৫ নম্বর অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো সাক্ষী হাজির করতে না পারায় তা বিবেচনায় নেয়নি আদালত।
গত ২২ সেপ্টেম্বর আসামি ও প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিভিএ) রাখে। ওইদিন জামিন বাতিল করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার মাঠপর্যায়ে ও দালিলিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে নানা অপরাধের প্রমাণ মেলে। ২০১১ সালের ১৫ মার্চ তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর ২৭ মার্চ তা আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ১১ জুন মানবতাবিরোধী ৭ ধরনের অপরাধের ২৮টি ঘটনায় জড়িত থাকার ১৭টি অভিযোগ গঠন করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় তার বিরুদ্ধে ৩৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন আর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন ৩ জন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি অষ্টম রায়। আলীম হচ্ছেন বিএনপির দ্বিতীয় নেতা, যার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলার রায় হয়েছে।
এর আগে সর্বশেষ ১ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল-১।
ফিরে দেখা:
গতবছর ১১ জুন ৭ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ১৭টি অভিযোগে আলীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল।
এগুলোর মধ্যে ১৫টিতে বিভিন্ন ঘটনায় মোট ৫৮৫ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। বাকি দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, আটক এবং দেশান্তরে বাধ্য করার ঘটনায়।
হত্যার অভিযোগের ১৫টি ঘটনার মধ্যে তিনটি গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে, যাতে মোট ৪০৬ জনকে হত্যা করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের।
২০১১ সালের ২৭ মার্চ জয়পুরহাটের বাড়ি থেকে আলীমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর চার দিন পর অশীতিপর এই ব্যক্তিকে এক লাখ টাকা মুচলেকায় ছেলে ফয়সাল আলীম ও আইনজীবী তাজুল ইসলামের জিম্মায় শর্ত-সাপেক্ষে জামিন দেয়া হয়, যার মেয়াদ পরে বাড়ানো হয় কয়েক দফায়।
গত আড়াই বছর জামিনে মুক্ত আলীম আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বনানীতে তার ছেলের বাড়িতে অবস্থান করেন। ফয়সাল আলীম মোবাইল ফোনের কনটেন্ট প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠান উইনটেলের মালিক।
২০১২ সালের ৯ জুলাই এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। জব্দ তালিকার সাক্ষীসহ প্রসিকিউশনের মোট ৩৫ জন আলীমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষে তার ছেলে সাজ্জাদ ছাড়াও সাক্ষ্য দেন জয়পুরহাটের বাসিন্দা মো. মামুনুর রশিদ চৌধুরী ও মো. মোজাফফর হোসেন।
১৯৭৫ ও ১৯৭৭ সালে জয়পুরহাট পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আলীম। ১৯৭৯, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনি বিএনপির টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জিয়াউর রহমানের সরকারে প্রথমে বস্ত্রমন্ত্রী এবং পরে যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন আলীম।