অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা করার লক্ষ্যে একটি নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অবকাঠামোর কথা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করার জন্য মুসলিম বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। মঙ্গলবার মদিনাত জুমিরাহ কনফারেন্স সেন্টারে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, এখন সময় এসেছে একটি নতুন পরিকল্পনা ও সহযোগিতার অবকাঠামো নিয়ে আমাদের সবাইকে সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করার। মুসলিম দেশগুলোর জন্য যে কোনো নতুন অংশীদারিত্বের কেন্দ্রবিন্দু হবে আমাদের জনগণ ও তাদের কল্যাণ।
তিনি আরো বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন অংশীদারিত্ব- এ থিমটি সময়োচিত হয়েছে। আগামী ৫ বছরের জন্য জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন একটি নতুন বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা করছে। বাংলাদেশ এতে নিরাপত্তার মর্যাদা, কল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অবকাঠামোতে জনগণের অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।
তিনি বলেন, সীমিত সম্পদ নিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এমডিজির ৮টি লক্ষ্যমাত্রার ৬টি পূরণ করেছে। এ সাফল্যের পিছনে স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কেবলমাত্র জনগণের দক্ষতা, জ্ঞান ও জ্ঞানভিত্তিক একটি সমাজের মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন করা যেতে পারে—এতে করে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত এবং ন্যায় বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত হতে পারে বলেও জানান আবদুল হামিদ।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প-২০২১-এর লক্ষ্য হচ্ছে সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের মাধ্যমে দেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা।
তিনি আরো বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশ্বকে আরো নতুনত্ব ও পরিবর্তনের সুযোগ সৃৃষ্টি করে দিয়েছে। আমরা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি সম্মুখীন হচ্ছি। অসমতা, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, ক্ষুধা ও রোগব্যাধি মুসলিম বিশ্বের জন্য অব্যাহত উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের উন্নয়নে পথে একটি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সুযোগ-সুবিধা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে বর্তমান বিশ্বে একটি নতুন ও সৃজনশীল পথ উদ্ভাবন করা আবশ্যক বলে জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশসমূহে উদ্ভাবনীমূলক ও টেকসই উন্নয়নের নতুন পথ বিবেচনার জন্য আট ট্রিলিয়ন ডলার বৈশ্বিক ইসলামী অর্থনীতির প্রয়োজন হবে।’
এ সময় এ বিষয়গুলো বিবেচনার জন্য কিছু বাস্তবসম্মত দিক তুলে ধরেন আবদুল হামিদ।
রাষ্ট্রপতি বলেন, মুসলিম দেশগুলোর সহজলভ্য উন্নয়ন, অর্থায়ন, বাজার প্রবেশাধিকার, বিনিয়োগ, সামর্থ্য গঠন ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আরো জোরদার, কার্যকর ও চাহিদা ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, পণ্য, সেবা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অর্থায়ন, জ্ঞান, জনগণের বৈশ্বিক চলাচলের সুবিধা কার্যকরভাবে গ্রহণ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের মতো দেশসমূহের ‘সক্ষম বৈশ্বিক পরিবেশ’ দরকার।
তিনি বলেন, ইসলামী বিশ্বে অধিকাংশ জনবহুল দেশে পর্যাপ্ত ‘উৎপাদনশীল সামর্থ্য’ এবং উন্নয়নশীল গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আমাদের দেশসমূহের উন্নয়নের বিষয়গুলো নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হচ্ছে ‘প্রযুক্তি’ এবং বাংলাদেশের মতো স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে প্রাণরক্ষাকারী প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অধিকতর সহজ প্রবেশাধিকার দরকার।
তিনি বলেন, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত বিধিনিষেধগুলো অবশ্যই দূর করতে হবে। অভিযোজনমূলক প্রযুক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের প্রয়াসের পূর্ণ সমর্থন দিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, জ্ঞানভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মুসলিম দেশসমূহের বিজ্ঞান প্রযুক্তি উদ্ভাবন সম্পর্কে ব্যাপক দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এই বিষয়টিকে শিক্ষা, কর্মসংস্থানের মতো সংশ্লিষ্ট সকল খাতে জাতীয় মানবসম্পদ পরিকল্পনার বিষয়টিকে দীর্ঘদিনের ধ্যান-ধারণার বাইরে থেকে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, মুসলিম বিশ্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে একই রকম নয় এবং আমাদের অনেক দেশ স্বল্প আয়ের ও স্বল্পোন্নত দেশভুক্ত। অনেকগুলো জলবায়ুর দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, এসব দেশের পরিস্থিতি ও ঝুঁকি সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের চাহিদা ও অন্যান্য বিষয় অংশীদারিত্বের যে কোন দিক থেকে বিশেষ করে আলাদা করে দেখতে হবে।’
তিনি বলেন, নতুন অনেকগুলো বিষয় ও উৎস রয়েছে, যা বেসরকারি খাতসহ আমাদের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলার লক্ষ্যে নতুন জ্ঞান ও সম্পদকে কাজে লাগাতে পারে।
রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজনের মতো জটিল চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলার লক্ষ্যে সামাজিক কল্যাণ সাধনে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ও প্রতিশ্রুত সম্পদ কাজে লাগানোর জন্য সব ধরনের নতুন ও উদ্ভাবনামূলক সম্পদ ও নিয়ামক ব্যবহার করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশ অংশীদারিত্বের বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন দিক বিবেচনা করতে প্রস্তুত। তবে উদ্ভাবনামূলক অংশীদারিত্ব হতে হবে পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা, সমঝোতা, পারস্পরিক স্বার্থ, কল্যাণ এবং সুষম বণ্টনের ভিত্তিতে।
এসব লক্ষ্য পূরণ ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে ব্যাপক ভিত্তিক অংশীদারিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল-মাকতুম, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন আবদুল রাজাক, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট নূরসুলতান নজরবায়েভ, পূর্ব তিমুরের প্রধানমন্ত্রী কে রালা জানানা গুসমাও, লুক্সেমবার্গের প্রধানমন্ত্রী জাভিয়ের বেটেল ও আইডিবি’র প্রেসিডেন্ট ড. আহমাদ মোহাম্মদ আলী আল-মাদানী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।