জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন সোমবার রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনিস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
হৃদরোগে আক্রান্ত হলে রোববার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় খ্যাতিমান এ স্থপতিকে। চিকিৎসকরা জানান তার ডায়াবেটিস ছিল মারাত্মক অনিয়ন্ত্রিত, রক্তচাপও ছিল খুব কম। এ পরিস্থিতিতে সোমবার বিকেল ২টা ৫৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
সন্ধ্যার পর শান্তিনগরে নিজ বাসভবনে নেয়া হয় তার মরদেহ। সেখানে স্বজন, গুণগ্রাহীদের দেখানোর জন্য রাখা হয় ২ ঘন্টা। এরপর মরদেহ বারডেমের হিমঘরে রাখা হবে। যুক্তরাজ্য থেকে তার মেয়ে এবং বোন দেশে ফিরলে দাফন করা হবে তাকে।
সৈয়দ মাইনুল হোসেনের জন্ম ১৯৫২ সালের ৫ মে। মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুজিবুল হক ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ইতিহাস শিক্ষক ছিলেন। ছেলেবেলায় মইনুল চেয়েছিল প্রকৌশল বিষয়ে পড়তে। ঢাকা তখন গণঅভ্যুত্থানে উত্তপ্ত। ওই সময় মাইনুলকে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ১৯৭০ সালে তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে। থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলে।
১৯৭১ সালে দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। মাইনুল তার পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে আশ্রয় নেন। খুব কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব করেন তিনি। ১৬ ডিসেম্বরের পর সৈয়দ মাইনুল হোসেন ফিরে যান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাসে।
১৯৭৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক হন।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের গণপূর্ত বিভাগ মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরপর নকশা আহ্বান করা হয়। তখন ২৬ বছরের তরুণ স্থপতি মাইনুল স্মৃতিসৌধের নকশা জমা দেন। প্রায় ১৭-১৮ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তিনি প্রথম হয়ে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার পান। আর তার করা নকশা অনুসারে ঢাকার অদূরে সাভারে নির্মিত হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ।
১৯৭৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সৈয়দ মাইনুল হোসেন ৩৮টি বড় বড় স্থাপনার নকশা করেন। এর মধ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন, চট্টগ্রাম ইপিজেড, বাংলাদেশ চামড়াজাত প্রযুক্তির কর্মশালা ভবন, উত্তরা মডেল টাউন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার খাদ্য গুদামের নকশা, কফিল উদ্দিন প্লাজা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস ভবন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের নকশা করেছেন তিনি।
স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন কবি গোলাম মোস্তফার দৌহিত্র। শান্তিনগরের যে বাড়িটিতে তিনি নিভৃতে বাস করতেন, সেটি কবি গোলাম মোস্তফার। স্থপতি বিয়ে করেছিলেন, তার দুটি মেয়ে আছে। কিন্তু তার সঙ্গে বসবাস করা সম্ভব হয়নি তার স্ত্রীর। দুই যুগের বেশি সময় ধরে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে তার। মেয়ে দুটি বড় হয়েছে। বাবা তার মেয়েদের দেখতে পান না।
প্রায় দুই যুগ ধরে সবার থেকে দূরে, আড়ালে আছেন তিনি । আমরা পারিনি তার কাজের যোগ্য সম্মান দিতে। একুশে পদক প্রাপ্ত এই গুণী শিল্পী চলে গেছেন নিরব অভিমানে।