তারেক রহমান একজন জীবন্ত উন্মাদ— তাকে অর্ধ উন্মাদ বললেও সম্মান করা হবে আর এ উন্মাদ অবস্থাতেই তার শেষ পরিণতি ঘটবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী।
বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অগ্রণী রিসার্চ নামের এক সংগঠনের ‘ইতিহাসের আলোকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও ৭ মার্চের তাৎপর্য’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় আবদুল গাফফার চৌধুরী এ কথা বলেন।
গতকাল বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর লন্ডনের এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিয়ে তারেক রহমান কটূক্তি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন লন্ডনপ্রবাসী সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী।
গাফফার চৌধুরী বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন বলে এ কে খন্দকারের প্রকাশিত বইয়ে যে তথ্য দেয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভুল। ১৯৭১ সালের ৪ জানুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্যপদের শপথ নেয়ার সময় বঙ্গবন্ধু জয় পাকিস্তান বলেছিলেন। তবে ৭ মার্চের ভাষণে নয়। এমনকি ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যেখানে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি ব্যবহারের দরকার ছিল, সেখানে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ অথবা ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ঊচ্চারণ করেন। এ কে খন্দকারকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। যারা করেছে, তারা জামাতে ইসলামীর কেউ না। তারা আমাদেরই লোক। নাম বলতে চাই না। শত্রু বাড়াতে চাই না। তারা নানা সুবিধা পাওয়ার জন্য এসব কথা বলেন। তাদের প্যাথলজিক্যাল হেট্রেট আছে, বঙ্গবন্ধুর ওপর, আওয়ামী লীগের ওপর, শেখ হাসিনার ওপর।’ ৭ মার্চের ভাষণ তাঁর নিজ গুণে আন্তর্জাতিক চরিত্র ধারণ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় তিনি বলেন, তারেক রহমান বীরত্বের সঙ্গে দেশে চেহারা দেখাতে পারেন না। জামাতের লোক নিয়ে তিনি লাখ পাউন্ড খরচ করে বিদেশে সভা করেন। আর পালিয়ে বেড়ান। তাকে চিৎকার করতে দিন। তার চিৎকারে বঙ্গবন্ধুর কিছু হবে না। একদিন জিয়াউর রহমানের বাড়িতে গিয়ে দেখি—তিনি তারেককে বেল্ট খুলে প্রহার করছেন। রক্তাক্ত তারেকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন খালেদা জিয়াও। শাহীন কলেজে এক মেয়েকে চুমু দেয়ার অপরাধে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এ সেই তারেক রহমান।
আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে দুই বার স্বাধীন করেছেন। একবার পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে। আরেকবার ভারতের সেনাবাহিনীকে বাংলদেশ থেকে নিয়ে যেতে বলে। এটা আরেকটা স্বাধীনতার সমান। জিয়া স্বাধীনতাযুদ্ধে যা-ই করুক না কেন, বঙ্গবন্ধু দেশে না এলে ইন্ডিয়ান আর্মিদের তাড়াতে পারত না। সে নিজেই বিদেশে পালিয়ে যেত।
অগ্রণী রিসার্চের মহাপরিচালক মোনায়েম সরকারের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী, অগ্রণী রিসার্চের পরিচালক নূরউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
প্রসঙ্গত : ‘ইয়াহিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করেছিল বঙ্গবন্ধু’
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আসার ঠিক আগে ইয়াহিয়া খানকে প্রেসিডেন্ট মেনে তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমঝোতা করেছিলেন বলে দাবি করেছেন তারেক রহমান। বিজয় দিবস উপলক্ষে সোমবার লন্ডনে বিএনপির এক আলোচনা সভায় এ দাবি করেন জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ছেলে যিনি এর আগে এই ধরনের কয়েকটি অনুষ্ঠানে ইতিহাস নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য হাজির করেছিলেন।
ইস্ট লন্ডনের অ্যাট্রিয়াম ব্যাংকোয়েট হলে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত ওই আলোচনা সভায় দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক আবারও তার বাবা জিয়াকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও প্রথম রাষ্ট্রপতি বলে দাবি করেন।
শায়েস্তা চৌধুরী কুদ্দুসের সভাপতিত্বে ও কয়েস আহমেদের পরিচালনায় শুরু হওয়া এ সভায় বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মীর মো. নাছিরউদ্দিনও ছিলেন।
বিএনপির ৫০০ শতাধিক নেতা-কর্মী-সমর্থক এই সভায় যোগ দেন, যার ব্যানারে প্রধান অতিথি তারেককে ‘দেশনায়ক’ বলা হয়।
১৯৭১ সালের ১৭ থেকে ২৫ মার্চের ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরে তারেক বলেন, তখন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে সমঝোতা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর।
১৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন, ২৫ মার্চ পর্যন্ত ছিলেন .. শেখ মুজিব এক অফিসারকে বলেছিলেন, ১১ জনের বিষয়ে সমঝোতার কথা, তা হয়েছিল এই সময়েই। ১১ জন মন্ত্রীর ব্যাপারে জাতীয় সরকার গঠনের শেখ মুজিবের সঙ্গে ইয়াহিয়ার মতৈক্য হয়েছিল। এখানেই কিন্তু শেষ নয়, ২৪ মার্চ আবার শেখ মুজিব ও ইয়াহিরার প্রতিনিধিদের আলোচনায় চারটি বিষয়ে মতৈক্য হয়েছিল। ... শেখ মুজিব কিন্তু ইয়াহিয়াকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে এক্সসেপ্ট করে নিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ছিল না দাবি করে এরপক্ষে এ কে খন্দকার এবং বদরুদ্দীন উমরের লেখা উদ্ধৃত করে শোনান তারেক।
জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে তিনি এর পক্ষে স্বাধীনতার পর সংবাদপত্রে প্রকাশিত জিয়ার একটি নিবন্ধ তুলে ধরেন তিনি।
‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামের ওই লেখায় জিয়া বলেছিলেন- বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তার জন্য ছিল ‘গ্রিন সিগন্যাল’।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আওয়ামী লীগ বিকৃত করছে দাবি করে তারেক বলেন, গত ৪০ বছর ধরে আমরা একটি দলের মিথ্যা মিথ্যা মিথ্যা বারবার শুনে এসেছি। এই দখলদার রং হেডেড শেখ হাসিনা একটার পর একটা অপকর্ম করেই চলেছে। যখনই বিপদে পড়ে, বিপদে পড়লেই জনগণকে ধোঁকা দিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।
তারেক বলেন, সেজন্য মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি মনে করেন তিনি।
২১ আগস্টসহ বিভিন্ন মামলা মাথায় নিয়ে ছয় বছর ধরে লন্ডনে থাকা তারেক প্রবাসে বিএনপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। লন্ডন থেকে মালয়েশিয়া গিয়ে একটি সভায়ও যোগ দেন তিনি।
এর মধ্যে এই বছরে আগস্টে এক সভায় বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারকে ‘বাংলাদেশের অভিশাপ’ এবং আওয়ামী লীগকে ‘কুলাঙ্গারের দল’ বলেন তারেক।
কয়েক মাস আগে আরেক সভায় নিজের বাবা জিয়াউর রহমানকে ‘বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি’ বলে দাবি করেন তারেক। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে ‘অবৈধ প্রধানমন্ত্রী’ বলেন তিনি।
এসব বক্তব্যের জন্য ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের তীব্র বাক্যবাণ তারেককে লক্ষ্য করে। সেইসঙ্গে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিও উঠেছে।
টানা কয়েকটি সভায় বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য বাংলাদেশে তারেকের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগে কয়েকটি মামলা হয়েছে। এরইমধ্যে জারি করা হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।