বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতা' দেয়ায় নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। পুলিশের 'মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ' নির্মম পেট্রোলবোমা হামলার 'জবাব' হতে পারে না বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল 'বাংলাদেশ: এক্সেসিভ পুলিশ ফোর্স নট দ্য অ্যানসার টু হরিফিক পেট্রোল কেস অ্যাটাক' শিরোনামে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেছে।
এতে বলা হয়, পুলিশ বাহিনীকে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা দমনে যে 'অবাধ ক্ষমতা' দেয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে কেবল অবনতির দিকে নিয়ে যাবে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেট্রোলবোমা হামলা ও সহিংসতা রোধে রাজধানীতে এক সমাবেশে পুলিশ বাহিনীকে যে 'মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছেন' তা উদ্ধৃত করা হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশবিষয়ক গবেষক আব্বাস ফয়েজ বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ও এতে বিক্ষোভ দমনে পুলিশ বাহিনীকে মাত্রাতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় বল প্রয়োগের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমনকি এতে বিক্ষোভ দমনের জন্য প্রয়োজনে বিচারবহির্ভূত হত্যা করার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যা, যা বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায়ই করে থাকে।'
বিবৃতিতে বলা হয়, 'সম্প্রতি পুলিশ ও র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যা ব) যৌথ অভিযানে এক ডজনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছেন। অতীতেও র্যা বের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ১২ থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে র্যা বের হাতে ১০ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। পরে পুলিশ এসব হত্যাকে গুলি বিনিময় বলে অভিহিত করেছে।'
পুলিশ অভিযানে বিচারবহির্ভূত হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও এজন্য যারা দায়ী তাদের বিচারের সম্মুখীন করার আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।
বিবৃতিতে আব্বাস ফয়েজ বলেন, 'নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু এ ধরনের দায়িত্ব পালনের অর্থ এই নয় যে তারা আইনের ঊর্ধ্বে এবং মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।'
আন্তর্জাতিক আইন ও মানদণ্ড অনুযায়ী পুলিশ কেবল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বলপ্রয়োগ করতে পারে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, সব সময় মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাশীল হতে হবে ও সচেষ্ট থাকতে হবে যেন অভিযানের সময় হতাহতের সংখ্যা যথাসম্ভব কমিয়ে আনা যায়।
আন্তর্জাতিক আইনে শুধু জীবন রক্ষার জন্য মারণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিক্ষোভ ও পেট্রোলবোমাপেট্রোলবোমার জবাব বলপ্রয়োগ হতে পারে না: অ্যামনেস্টি
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির 'দ্রুত অবনতি' হচ্ছে জানিয়ে বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা ঢাকা ও অন্য বড় শহরগুলোর রাজপথে 'সংঘর্ষে লিপ্ত' হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে। তাদের অধিকাংশকে ছেড়ে দেওয়া হলেও এখনও শত শত বিক্ষোভকারী অন্তরীণ রয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশব্যাপী লাগাতার অবরোধের ডাক দিয়েছে। ইতিমধ্যে অবরোধ চলাকালে সহিংসতায় দুই ডজন মানুষ নিহত এবং কয়েকশ' লোক আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। আর এসবের বেশিরভাগই ঘটছে যানবাহনে ছোড়া পেট্রোলবোমা নিক্ষেপের কারণে।
অ্যামনেস্টি বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও সমাবেশের অধিকার সংরক্ষিত আছে। কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বে যে 'সহিংস বিক্ষোভ' চলছে, তার ধরন দেখে অনুমান করা যায় এটি কেবল 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত'।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত 'অপরাধমূলক তৎপরতা' বন্ধের জন্য বিএনপি নিজ দলের কর্মী-সমর্থকদের নিবৃত্ত করবে বলে বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করা হয়। এ ধরনের তৎপরতা রোধে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগেরও আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত সহিংসতার নিন্দা প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। একইসঙ্গে এসব কাজে জড়িত দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে পরিচালিত যে কোনো তদন্তকাজে সহযোগিতা দেওয়ার জন্যও আহ্বান জানানো হয়।
উল্লেখ্য, দশম সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে ৫ জানুয়ারি কর্মসূচি পালনে ব্যর্থ হয়ে সারা দেশে লাগাতার অবরোধের ডাক দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান অবরোধে নাশকতা ও সহিংসতায় অন্তত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। যানবাহনে দেওয়া আগুন ও পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয়েছে বহু মানুষ।