জাতীয়

দুই নেত্রীকে সংলাপে বসার আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের

বান কি মুন
বান কি মুন

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা থেকে উত্তরণে সংলাপে বসতে দুই নেত্রীকে আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লেখা পৃথক দুই চিঠিতে বান কি মুন এ আহ্বান জানান।

নিউইয়র্ক ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষ থেকে দুই নেত্রীকে চিঠি দেয়ার বিষয়টি গত রোববার নিশ্চিত করেছে।

সূত্রটি জানায়, প্রধানমন্ত্রীকে বান কি মুন গত ৩০ জানুয়ারি চিঠি লিখেন। এর কয়েক দিন পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠিটি পৌঁছানো হয়। একই সময়ে বিএনপির চেয়ারপারসনকেও চিঠি পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি ওই দুই চিঠিতে বান কি মুন উল্লেখ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বান কি মুনের চিঠি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে আবদুল মোমেন গতকাল মঙ্গলবার সকালে (ঢাকার সময়) বলেন, ‘এ সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।’ এ ধরনের চিঠি ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর মাধ্যমে পৌঁছানো হয়েছে কি না প্রশ্ন করা হলে আবদুল মোমেন বলেন, সেটি হতে পারে।

তবে সরকারের ঊচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে চিঠিটি ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আবার বিএনপির চেয়ারপারসন কার্যালয়ের একটি সূত্র গতকাল রাতে জানায়, খালেদা জিয়াকে লেখা বান কি মুনের চিঠিটিও গত সপ্তাহে পৌঁছেছে।

জাতিসংঘের মহাসচিবের সহযোগী মুখপাত্র এরি কানেকো ১২ ফেব্রুয়ারি ই-মেইলে জানান, বান কি মুন বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

জানা গেছে, দুই চিঠিতেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্বের প্রসঙ্গটি টানেন বান কি মুন। বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সূচকের পাশাপাশি আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনের প্রশংসা করেন জাতিসংঘের মহাসচিব। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগদানকারী অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের স্বার্থে শান্তি ও স্থিতিশীলতা জাতিসংঘের আগ্রহের বিষয় বলে বান কি মুন উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের চলমান সহিংসতায় জাতিসংঘের গভীর উদ্বেগের কথা তুলে ধরে নিরপরাধ লোকজন সহিংসতার শিকার হওয়ায় তিনি গভীর উদ্বেগ জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা চিঠিতে বান কি মুন বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংসদের বাইরের বিরোধীদলকে নিয়ে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানান। চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক উন্নয়নের ব্যাপারে জাতিসংঘ মহাসচিব ব্যক্তিগতভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তাই সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক (সাবেক) সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে তারানকোকে বাংলাদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন কি না সেটি তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেননি।

খালেদা জিয়ার কাছে লেখা চিঠিতে সহিংসতা বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন বান কি মুন। বাংলাদেশে চলমান সমস্যার সমাধানে তিনি তারানকোকে দায়িত্ব দেয়ার বিষয়টি চিঠিতে উল্লেখ করেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লেখা এটাই প্রথম চিঠি। অবশ্য নির্বাচনের আগের বছর ২০১৩ সালে তিনি দুই নেত্রীকে সংলাপে বসতে মে ও নভেম্বর মাসে চিঠি লিখেন। আর একই অনুরোধ জানিয়ে দুজনকে ফোন করেন আগস্টে।

নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতপার্থক্য দূর করতে জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের দূত হিসেবে তারানকো ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিন দফায় ঢাকায় আসেন। ২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি ছয় দিনের জন্য বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সফরের সময় তিনি দুই দলকে আলোচনার টেবিলে বসালেও তাদের মতপার্থক্য দূর করতে পারেননি। তাই দুই দলকে দুই দফায় টেবিলে বসানোর ‘সাফল্য’ নিয়েই ঢাকা ছেড়েছিলেন তারানকো।

এদিকে, গতকাল নিউইয়র্কে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, বাংলাদেশে জানমালের ক্ষয়ক্ষতিতে মহাসচিব উদ্বিগ্ন। তিনি আন্তরিকভাবে এর শান্তিপূর্ণ সমাধান চান। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি এ তথ্য জানান।

বাংলাদেশ সরকার চাইছে না তারানকো ঢাকা সফর করুন— বাংলাদেশের কিছু পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এমন খবরের বিষয়ে জানতে চাইলে ফারহান হক বলেন, তারানকোকে আবার ঢাকায় পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে নেই। মহাসচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি শুধু বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং তিনি সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে ২০১৩ সালেও শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লেখেন। আগস্টে একই আহ্বান জানাতে তিনি দুই নেত্রীকে টেলিফোনও করেন।

বান কি-মুনের দূতিয়ালিতে ওই সময় দুই দফা ঢাকা সফর করেন অস্কার ফারনান্দেজ তারানকো। ঢাকায় আসার পর বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কয়েক দফা বসে বৈঠকে বসেন সহকারী মহাসচিব। সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার তাগাদা দিয়ে যান তিনি।

বান কি-মুনের দূতিয়ালির পরও ওই সময় সংলাপ ব্যর্থ হয় এবং বিএনপির বর্জনে সহিংসতার মধ্যে ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসে আওয়ামী লীগ।

ওই নির্বাচনের পর একবছর পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও নির্বাচনের বর্ষপূর্তি ঘিরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের নতুন আন্দোলনে আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। টানা হরতাল অবরোধ চলছে দেশের। বিভিন্ন স্থানে বাসে- ট্রাকে পেট্রোল বোমা হামলায় প্রায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

গত ৫ জানুয়ারি ঢাকায় সমাবেশ করতে না পেরে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সারা দেশে লাগাতার অবরোধের ডাক দেন।

সরকারি তথ্য মতে, অবরোধের এই দেড় মাসে পেট্রোল বোমা ও ককটেল হামলায় সারা দেশে নিহত হয়েছেন ৫৫ জন, আহত হয়েছেন ৫৫৬ জন।

এ সময় ৬৬৪টি যানবাহন পেট্রোল বোমা দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ৪১০টি যানবাহন ভাঙচুর করেছে অবরোধ সমর্থকরা। ২৮টি স্থাপনা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। রেলপথে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে ২৫টি; নৌপথে ছয়টি। নাশকতার কয়েকটি ঘটনায় খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে মামলাও হয়েছে। অবশ্য বিএনপি বলে আসছে, সরকারি লোকেরাই নাশকতা করে ২০ দলের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।

জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষকেই সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

গত বুধবার জাতিসংঘ সদরদপ্তরে মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিক বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানিতে সংস্থার পক্ষ থেকে উদ্বেগের কথা জানান।

ওই সময় তিনি জানান, মহাসচিব বান কি মুন সাবেক সহকারী মহাসচিব (রাজনীতি বিষয়ক) অস্কার ফারনান্দেজ-তারানকোকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দায়িত্ব দিয়েছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান সম্প্রতি ভারতীয় দৈনিক টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে বলেন, সংকট নিরসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংলাপ আয়োজনে জাতিসংঘের যে কোনো উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানাবেন।

জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠির বিষয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও দলটির নেতারা সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করেন। নেতারা বলেন, বিএনপি যতদিন ‘নাশকতার রাজনীতি’বন্ধ না করবে, ততদিন তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হতে পারে না।

এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংলাপের প্রস্তাব নাকচ করে দেন।

দেশটিভি/আরসি
দেশ-বিদেশের সকল তাৎক্ষণিক সংবাদ, দেশ টিভির জনপ্রিয় সব নাটক ও অনুষ্ঠান দেখতে, সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল:

এছাড়াও রয়েছে

সিলেটে ভোক্তা অধিদপ্তর ও সিসিএস-এর সচেতনতামূলক সভা

ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলুন: প্রধানমন্ত্রী

চোরাগলি দিয়ে সরকার উৎখাতের সুযোগ নেই: ওবায়দুল কাদের

এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনা ৫৩৭১, মৃত্যু ৬২৮৪ জনের

খুলনায় দুই দিনের ‘পরিবহন ধর্মঘট’ চলছে

২৫ অক্টোবর আংশিক সূর্যগ্রহণ

ভোজ্যতেল নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারি

সুদানে জাতিগত সংঘর্ষ নিহত অন্তত ১৫০

সর্বশেষ খবর

স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার নারী দিবস উদযাপন

শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ করলেন মোস্তাফিজুর রহমান

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইউল্যাব’ শিক্ষার্থীদের ফটোওয়াক

ভান্ডারিয়া ও মঠবাড়িয়ায় পৌর প্রশাসক নিয়োগ