এ বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আরো একধাপ এগিয়ে যাবে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে—জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে দেয়া ভাষণে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সূত্র: বাসস।
সোমবার সংসদে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রস্তাবিত বাজেটকে জনকল্যাণমুখী অ্যাখ্যা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ বাজেট জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও কল্যাণের পথ সুগম করবে— দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।
শত প্রতিকূলতার মাঝেও ভোট দিয়ে এ সরকারকে ক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, 'জনগণ এ সরকারকে নির্বাচিত না করলে এ বাজেট উপস্থাপন সম্ভব হতো না।'
সপ্তমবারের মতো বাজেট উপস্থাপন করায় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, 'তার এ বাজেট বাংলাদেশকে প্রতি পদে পদে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে বাংলাদেশকে জাতির পিতার আদর্শ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে, যা ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হিসেবে বাঙালি জাতিকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আজ আর কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এক বছরের ব্যবধানে ৫৮তম স্থান থেকে ১৪ ধাপ এগিয়ে এখন ৪৪তম স্থানে উন্নীত হয়েছে— বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, অর্থনৈতিকভাবে তারা স্বাবলম্বিতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
ক্রয়ক্ষমতার যে সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ২০১৩ সালের ৩৬তম অবস্থান থেকে তিন ধাপ এগিয়ে ২০১৫ সালে ৩৩তম অবস্থানে এসেছে। বাংলাদেশ স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বলেই এবার ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে পেরেছে। ৬ বছরে বাজেটের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান তিনি।'
তিনি বলেন, 'বাজেটের আকার বড় হলেও এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য— বিগত অর্থবছরে বিএনপি-জামাতের নৈরাজ্য, লাগাতার ৩ মাস হরতাল-অবরোধের পরেও সরকার বাজেটের ৯৫.৬৭ ভাগ বাস্তবায়ন করেছে।'
শেখ হাসিনা বলেন, 'আওয়ামী লীগ জনগণের সংগঠন— বঙ্গবন্ধু জনগণের কল্যাণের জন্য এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জনগণের সেবা এবং জনগণের জন্য কাজ করাই হচ্ছে এ সংগঠনের মূল লক্ষ্য। আওয়ামী লীগের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। সে প্রত্যাশা পূরণই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য। এজন্য আওয়ামী লীগ যখনই সরকার গঠন করে তখন দেশে বিনিয়োগ বাড়ে, অর্থনীতি শক্তিশালী হয়, গরিব মানুষের উন্নয়ন হয়। কারণ আওয়ামী লীগ সরকার সব সময় মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করে।
তিনি বলেন, 'জাতির পিতাকে হত্যার পর এদেশের মানুষের জীবনে দুঃখ-দুর্দশা নেমে আসে। ২১ বছর মানুষ অনেক কষ্ট করেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন মানুষ বুঝতে পারে জনগণের জন্য সরকার কাজ করে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল ছিল স্বর্ণযুগ। পরবর্তী ৭ বছর দেশের মানুষের জীবনে আবারও অমানিষার অন্ধকার নেমে আসে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সব ধরনের আর্থ-সামাজিক সূচকে বর্তমান সরকার সাফল্য অর্জন করেছে—দারিদ্র্যের হার ২০০৫ সালে ছিল ৪০ %, ২০১৫ সালে তা ২২. ৪% নেমে এসেছে। অতি দারিদ্র্যের হার ৭.৯% নেমে এসেছে। অতি দারিদ্র্যদের সরকার বিনামূল্যে খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৩১৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈশ্বিক মন্দা স্বত্ত্বেও গত ৫ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি ৬. ৫১% এবং এ বছর তা ৫ . ৫১%। মুদ্রাস্ফীতি এখন ৬.৫৭% রয়েছে। চলতি বছরে রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়াবে ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে ছিল ১০.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে ৭০.৭ বছরে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৫.০২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ৫ কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে জানান প্রধানমন্ত্রী।'
শেখ হাসিনা বলেন, 'মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন হয়েছে। মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। মানুষের পুষ্টি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার মাছ, মাংস ও ডিমসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার উৎপাদন বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।'
তিনি বলেন, 'বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে বর্তমানে দেশের ৭০ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। বর্তমানে ১৩ হাজার ৭২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এরপরও সোলার, পারমাণবিক ও কয়লাভিত্তিক বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠায় নেপাল ও ভুটান থেকে পানি বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ সৃষ্টি রয়েছে।'
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সমালোচকদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান থেকে সুন্দরবনের দূরত্ব অনেক। ফলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না।'
এক্ষেত্রে তিনি দিনাজপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থাপিত দিনাজপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে যদি প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি না হয়, তাহলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ক্ষতি কিভাবে করবে। বাংলাদেশের উন্নতি অনেকের সহ্য হয় না বলেই তারা এ ধরনের সমালোচনা করেন।'
তিনি বলেন, 'বর্তমান কৃষকবান্ধক সরকার কৃষককে ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট খুলে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। কৃষকদের বিভিন্ন উপকরণে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। ফলে কৃষকরা উৎপাদনমুখী হয়েছে।'
শেখ হাসিনা বলেন, 'বর্তমান সরকারের সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ ২০১৮ সালে শেষ হবে এবং আরও ১৩টি বৃহৎ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় ১৬ হাজার ৪৩৮ কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। এসব ক্লিনিকে বিনামূল্যে ৩০ ধরনের ওষুধ দেয়া হচ্ছে। মাতৃমৃত্যু প্রতিহাজারে ১.৭ জন এবং শিশুমৃত্যু ৩৩ জনে নেমে এসেছে।'
তিনি বলেন, 'সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ২৭ লাখ ২২ হাজার ৫০০ জন বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও বয়স্ক মানুষ ৪০০ টাকা হারে ভাতা পাচ্ছে। ৪ লাখ প্রতিবন্ধী বর্তমানে ভাতা পাচ্ছে। এ হার ৬ লাখে উন্নীত করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ১০ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। ৪ হাজার ৫৪৭টি ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে মানুষকে তথ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ১২ কোটি ৪৭ লাখ মানুষ মোবাইল সিম ব্যবহার করছে।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সংখ্যা ৪ কোটি ৫৭ লাখে উন্নীত হয়েছে। কৃষি খাতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। সারাদেশে ২৪৫টি কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্রে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন।'
শেখ হাসিনা বলেন, 'বর্তমান সরকারের সময়ে ক্রীড়া ক্ষেত্রেও ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। পাকিস্তান ক্রিকেট টিমকে হোয়াইটওয়াশ করার পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট সিরিজ জয় করেছে।'
বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমকে শিগগিরই সম্মাননা দেয়া হবে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, 'পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শেয়ারবাজারকে গতিশীল করতে এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর ফলে শেয়ার বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। যুব সমাজকে শেয়ারবাজার সম্পর্কে সচেতন করতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী ক্যান্সার রোগীদের ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে সকল শুল্ক কর প্রত্যাহার, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টিউশন ফির ওপর আরোপিত ১০% কর কমিয়ে ৭. ৫-এ আনা, ইউনানী ও ভেষজের ওষুধের মূল্য সংযোজন কর প্রত্যাহার, পোল্ট্রি শিল্পের আয়ের প্রথম ১৯ লাখ টাকা পর্যন্ত কর মওকুফ করে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫% ও ৩০ লাখের অধিক অর্থের ওপর ১০% হারে কর আরোপ করার প্রস্তাব করেন।
রপ্তানি আয়ের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ০.৬০% করার সুপারিশ করেন। মাছ চাষের ওপর অর্জিত আয়ের প্রথম ১৯ লাখ টাকা পর্যন্ত কর মওকুফ করে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫% ও ৩০ লাখের অধিক অর্থের ওপর ১০% হারে কর আরোপ করার প্রস্তাব করেন।