মুসলিম বিশ্বের কাছে দিনটি শোক ও বেদনার, পবিত্র আশুরা আজ-শনিবার। ধর্মীয়ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে পালন করছে বিশ্বের মুসলমানেরা।
সকালে হোসেনি দালানের ইমাম বাড়া থেকে বের হয় তাজিয়া মিছিল। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ এ মিছিলে অংশ নেন। ব্যানার ও সুদৃশ্য পোশাক পরা হাজারো মানুষের মিছিল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
এ সময় সকলের মুখে ঊচ্চারিত হায় হাসান, হায় হোসেন ধ্বনিতে মুখরিত হয় চারদিক।
এদিকে, যে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে হোসেনি দালান এলাকাসহ রাজধানী বিভিন্ন জায়গায় জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যাবস্থা, পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে র্যা ব।
আরবিতে 'আশারা' মানে ১০। এ কারণে দিনটি আশুরা নামে পরিচিত। ৬১ হিজরির এ দিনে ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালা প্রান্তরে শাহাদাতবরণ করেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র এবং হজরত আলী (রা.) ও হজরত ফাতেমা (রা.)-এর পুত্র ইমাম হোসাইন (রা.)। আজ শনিবার ১০ মহররম।
পঞ্চম খলিফা হজরত মুয়াবিয়া (রা.) হজরত মুগির (রা.)-এর পরামর্শে নিজ পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। ইসলামী শরিয়ায় বংশানুক্রমিক শাসন বা রাজতন্ত্র হারাম। তাই ইয়াজিদের কাছে বাইয়াত নিতে অস্বীকৃতি জানান ইমাম হোসাইন (রা.)। এর প্রতিবাদে তিনি মদিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান। মক্কা থেকে তিনি কুফার উদ্দেশে হিজরত করেন।
পথিমধ্যে কারবালায় থামে তার কাফেলা। ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীদের আটক করে মদিনায় ফিরিয়ে নিতে উমর ইবনে সাদ আবি ওক্কাসের নেতৃত্বে চার হাজার সৈন্য কারবালায় প্রবেশ করে। সিমার ইবনে জিলজুশান মুরাদিও কারবালায় সৈন্য সমাবেশ ঘটায়।
আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ইয়াজিদ বাহিনী ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শিবির অবরোধ করে। পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। শিবিরের নারী-শিশুসহ সবাই তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েন। কিন্তু ইমাম হোসাইন (রা.) আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানান। অবরোধ অব্যাহত থাকলে ১০ মহররম ইয়াজিদের বাহিনীর অবরোধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ইমাম হোসাইন (রা.)। অসম যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তার ৭২ সঙ্গী শাহাদাতবরণ করেন। সিমার ইবনে জিলজুশান কণ্ঠদেশে ছুরি চালিয়ে তাকে হত্যা করে।
মুসলমানদের কাছে ১০ মহররম একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দিন। কারবালার বেদনাদায়ক ইতিহাস ছাড়াও দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, এ দিনেই আল্লাহতায়ালা আকাশ ও মাটি সৃষ্টি করেন। কেয়ামত হবে এ দিনেই। ১০ মুহররম পৃথিবীতে হজরত আদম (আ.) আগমন করেন। নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর শত্রু ফেরাউনকে নীল নদে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। নূহ (আ.)-এর নৌকা ঝড় থেকে রক্ষা পায়। দাউদ (আ.)-এর তাওবা কবুল হয়। আইয়ুব (আ.) দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত ও সুস্থতা লাভ করেন। ঈসা (আ.)-কে ঊর্ধ্বাকাশে আল্লাহর নির্দেশে এ দিনেই উঠিয়ে নেওয়া হয়।
কারবালার শোকের দিনের অনেক আগেই মহানবী (সা.) জীবদ্দশায় আশুরার দিন রোজা রাখতেন। আবু হুরায়রা (রা.) হাদিসে বর্ণনা করেন, 'আমি রাসূলকে ১০ মহররম রোজা পালন করতে দেখেছি। আর বলতে শুনেছি, রমজানের রোজা ছাড়া অন্য যে কোনো সময়ের রোজার চেয়ে উত্তম মহররমের রোজা।'
আশুরার দিন সুন্নি মুসলমানরা রোজা রাখেন। তবে শিয়া সম্প্রদায় মার্সিয়া ও মাতমের মাধ্যমে এ দিনটি উদযাপন করে। বের করা হয় তাজিয়া মিছিল। আশুরা উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও পুরান ঢাকার হোসেনি দালান এলাকায় বর্ণ তাজিয়া মিছিল করা হয়।
আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা আশুরার শোককে শক্তিতে পরিণত করে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান।
আশুরা উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচার হবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়েছে বিশেষ নিবন্ধ।