বিজয় মাস ডিসেম্বর শুরু হলো আজ ১ ডিসেম্বর। দীর্ঘ ৪৪ বছর আগে ১৯৭১ সালের এ ডিসেম্বরেই নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাঙালির কাঙ্ক্ষিত মুক্তিসংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।
এবার ডিসেম্বর আসার আগেই বড় অর্জন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত যাদের হাত, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর নেপথ্যে রয়েছে যাদের ভূমিকা, তাদের দুই শীর্ষস্থানীয় নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে নভেম্বরে। সব মিলিয়ে এবারের ডিসেম্বরটি অন্যান্যবারের চেয়ে আলাদা। একাত্তরে এমনই এক ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে আমরা পেয়েছিলাম বিজয়।
বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বে পেয়েছিলাম একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, একটি লাল-সবুজের পতাকা। তাই ডিসেম্বর মাস বাঙালি জাতিসত্তা আর নিজস্ব ভূমির গৌরবদীপ্ত বিজয় ও অহঙ্কারের মাস।
১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সূচনা হয়েছিল ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকেই। আজকের দিনে মুক্তিবাহিনী সিলেটের শমসেরনগরে আক্রমণ চালিয়ে টেংরাটিলা ও দোয়ারাবাজার শত্রুমুক্ত করে। মুক্তিবাহিনীর অপারেশনের মুখে পাকিস্তানিরা সিলেটের গ্যরা, আলীরগাঁও ও পিরিজপুর থেকেও ব্যারাক গুটিয়ে নেয়। ডিসেম্বর মাস থেকেই মুক্তিপাগল বাঙালিরা বুঝতে পারে তাদের বিজয় সুনিশ্চিত।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। তবু গত কয়েক বছরের মতো এবারের বিজয়ের মাসও শুরু হয়েছে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকর করার সুদৃঢ় দাবির মধ্য দিয়ে।
গত ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে। এরই মধ্যে ২১ যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৬ জনের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির রায় হয়েছে। পাঁচজনের চূড়ান্ত রায় শেষে চারজনের ফাঁসির রায় কার্যকর এবং এক আসামি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আমৃত্যু সাজা ভোগ করছেন। মতিউর রহমান নিজামীর আপিলের শুনানি চলছে।
পাশাপাশি একটি অশুভ গোষ্ঠী জাতির আকাঙ্ক্ষিত এ বিচার কার্যক্রম বানচালের হীন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। প্রতি বছরের মতো এবারও বিজয়ের মাসে দেশবাসী বিজয়ের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হবে। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শোকে মুহ্যমান হয়ে মাথা নোয়াবে অগণিত মুক্তিযোদ্ধার প্রতি।
বিজয়ের স্মারক ডিসেম্বরের প্রথম দিনটিতে বরাবরের মতো আজ দেশজুড়ে পালিত হবে মুক্তিযোদ্ধা দিবস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতীয় পুনর্জাগরণ, মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-আর্থিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মানবোধ জাগানোর লক্ষ্যে প্রতি বছরের মতো এবারও দিবসটি পালিত হবে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করবে। এর আগে সোমবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা ৫ মিনিট পর্যন্ত সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ '৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে 'ডিসেম্বর : বিজয়গাথা' শীর্ষক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিজয়ের মাসের প্রথম প্রহর উদযাপন করেছে। সম্মিলিত দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশন এবং মশাল ও আলোক প্রজ্বালনের মাধ্যমে এখান থেকেই সূচনা ঘটেছে মাসব্যাপী নানা কর্মসূচির।
আজ সকাল সাড়ে ১০টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে শুরু হয় 'যুদ্ধাপরাধীমুক্ত বাংলাদেশ চাই' শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীন চত্বরে গিয়ে শেষ হয় এবং পরে সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করবেন মুক্তির গান। শিশু একাডেমি সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় পতাকা নিয়ে আনন্দ শোভাযাত্রা করেছে। এ শোভাযাত্রা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।
মুক্তিযোদ্ধা দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটি আজ সকাল সাড়ে ৭টায় মিরপুর মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, সকাল সাড়ে ৯টায় শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের জমায়েত এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তন অভিমুখে বিজয় শোভাযাত্রার কর্মসূচি পালন করবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রতিনিধিদের নিয়ে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও মুক্তিযোদ্ধা দিবস উদযাপন কমিটি আলোচনা অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।