আজ- রোববার ঐতিহাসিক ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার পতন দিবস। ১৯৯০ সালের এ দিনে তীব্র আন্দোলন ও গণঅভুত্থানে পতন হয় স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের। এরপর এ ২৫ বছরে সরকার বদল হয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু সেই এরশাদকেই প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ-বিএনপি নিজেদের জোটে ভিড়িয়েছে। এখনো রাজনীতির মাঠে অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থান নিয়েই টিকে রয়েছেন এরশাদ।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলের ঘটনাক্রম তার পতন ও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষপটে তার অবস্থানের তুলে ধরা হলো।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ। বন্দুকের নলের মুখে রক্তপাতবিহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন সেনাবাহিনী প্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরপর ৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। ওই দিনই দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা নিজের অধিকারে নেন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আ ফ ম আহসানুদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে।
১৯৮৩ সাল থেকেই এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নামে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ১৫ দলীয় জোটের ও বিএনপি ৭ দলের নেতৃত্ব দেয়। আর অন্য ৫টি বাম দলও শরীক হয় আন্দোলনে।
১৯৮৬ সালের ১ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ওই বছরের ৭ মে ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ ৮ টি দল অংশ নিলেও বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করে।
৮৭-তে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ১০ নভেম্বর দেশের দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সম্মিলিতভাবে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে। তাদের একমাত্র দাবি ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা। অবরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকায় বুকে পিঠে সাদা রঙে 'স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক' লিখে মিছিলে অংশ নেন নূর হোসেন।
মিছিলটি ঢাকা জিপিও-র সামনে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি আসলে স্বৈরশাসকের মদদপুষ্ট পুলিশবাহিনীর গুলিতে নিহত হন নূর হোসেনসহ তিনজন। আহত হন অনেকেই। ওই ঘটনা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
উত্তাল আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যায় ৯০ এর ডিসেম্বরে, আন্দোলন রুপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। গণবিক্ষোভের চাপে এবং সেনাবাহিনীর সমর্থনের অভাবে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ৪ ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা আর ৬ তারিখ তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপির ক্ষমতাগ্রহণের মধ্যদিয়ে শুরু হয় গণতন্ত্রের নবযাত্রা।
আওয়ামী লীগ দিনটিকে পালন করে গণতন্ত্র মুক্তি দিবস হিসেবে। আর বিএনপি পালন করে স্বৈরাচার পতন দিবস হিসেবে।
সেদিন যারা এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন, রাজনীতির প্রয়োজনে তারাই আবার কাছে টেনে নিয়েছেন এরশাদকে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দ'দুলের সঙ্গেই জোটভুক্ত হয়ে রাজনীতি করেছেন এরশাদ। আর এখন তিনি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারেরই অংশ, সংসদে তার দল জাতীয় পার্টি বিরোধীদলের আসনে থাকলেও মন্ত্রীর পদমর্যাদা নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদে রয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, গণতন্ত্রের দুই প্রধান দাবিদার আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ব্যর্থতা ও দুর্বলতার কারণে আজও রাজনীতির মাঠ সরগরম করতে পারছেন এরশাদ।