বিএনপি-জামাত স্বাধীনতাবিরোধী— তারা দেশের উন্নয়ন চায় না দেশকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে—এ কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন আওয়ামী লীগ যা বলে তা করে— এ দল ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়ন হয়।
শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের খানবাড়ীতে এক জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০৪১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ আর দরিদ্র থাকবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করে দেশকে অভিশাপমুক্ত করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘মিথ্যা মামলায় হয়রানির’ অভিযোগ নাকচ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যারা মানুষ হত্যা করেছে, যারা হুকুম দিয়েছে- তাদের সবার বিচার বাংলাদেশে হবে।
আবারো প্রমাণ হলো বাঙালিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না বলে জানান তিনি।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পদ্মা সেতুর কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলেও এ সময় তিনি অভিযোগ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, কেউ গুনাহ করলে মৃত্যুর পর দোজখের আগুনে পুড়বে— বিএনপি-জামাত দেশের মানুষকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়েছে। এখন বলছে, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যারা এসব করেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে না তো কি ফুলের মালা গলায় দিয়ে পূজা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস— এ মাসে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাঙালি জাতিকে দাবায় রাখা যাবে না। সে কথা সত্য হয়েছে। বাঙালিকে দাবায় রাখা যায়নি। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। খাদ্যের জন্য বাংলাদেশকে অন্যের কাছে ভিক্ষা চাইতে হয় না, হাত পাততে হয় না।
শেখ হাসিনা বলেন, ওয়াদা করেছিলাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করব। আমরা তা করেছি। বাকিদের বিচারকাজ চলছে। যত চেষ্টাই করুক, কেউ এই যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে পারবে না।
লাখ জনতার উপস্থিতিতে দুপুরের মধ্যেই কানাকানায় ভরে যায় মেদেনী মণ্ডলের খানবাড়ির জনসভাস্থল। স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিমার্ণ কাজের উদ্বোধন শেষে মুন্সীগঞ্জে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এ জনসভায় নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জনতার শ্লোগান, ঢোল-বাদ্যের তাল আর করতালির মধ্যদিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ।
বেলা একটা দেয়া ভাষণে শেখ হাসিনা যে বললেন:
শত বাধা পাড় করে বাংলাদেশ যে নিজের অর্থে কাজ করতে পারে আজ তা প্রমাণ করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বেলা একটার দিকে, জাজিরা পয়েন্ট- মাওয়া পদ্মাসেতুর নদী শাসন, মাওয়ায় মূল সেতুর কাজ উদ্বোধন করে এসব কথা বলেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সেই জাতি, যে জাতি সম্পর্কে জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘কেউ দাবায়া রাখতে পারবা না আজকেও সেটি প্রমাণিত হতে যাচ্ছে।
কারও কাছে হাত পেতে নয় নিজেদের অর্থ দিয়ে আজ এ কাজ শুরু হলো—এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।
এর আগে শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণকাজের উদ্বোধন শেষে সুধী সমাবেশে শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ষড়যন্ত্রের একটি অংশ ছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের প্রকল্প হাতে নিলে বিশ্বব্যাংক এগিয়ে আসে— তবে হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই তারা দুর্নীতির অভিযোগ আনে। যদিও এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা (বিশ্বব্যাংক) বিএনপি সরকারের সময়ের ২টি দুর্নীতির কাগজ দেখিয়েছে।
তিনি বলেন, বড় কাজ করতে গেলে ‘হাত পাততে হবে—এ মানসিকতা ভাঙতেই নিজস্ব অর্থায়নে দেশের সবচেয়ে বড় এই অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, আমি চেয়েছিলাম, আমরা পারি, আমরা তা দেখাব।… আজ আমরা সেই দিনটিতে এসে পৌঁছেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালি জাতি কারও কাছে মাথা নত করেনি, করবেও না।
পদ্মা সেতু:
২০১৮ সালের মধ্যে ৬ .১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। নিজস্ব অর্থায়নে এটি এ পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর জন্য খরচ হবে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এই সেতু হলে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়কপথে যুক্ত হবে দক্ষিণাঞ্চল। এ সেতুতে ট্রেনও চলবে। এশিয়ান হাইওয়ের পথ হিসেবেও সেতুটি ব্যবহৃত হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মা সেতু ঘিরে হংকংয়ের আদলে নগর গড়ার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। মাওয়া থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত চার লেনের সড়ক হবে। রাজধানীর বিজয়নগর থেকে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে হবে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়ালসড়ক।
প্রকল্পের ২৭ শতাংশ কাজ হয়েছে। এর মধ্যে সেতুর কাজের ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ, নদীশাসন কাজের ১৩ শতাংশ এবং উভয় প্রান্তে সংযোগ সড়কের প্রায় ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। পদ্মা সেতুতে মোট পিলার থাকবে ৪২টি। এর মধ্যে ৪০টি পিলার থাকবে নদীর ভেতরের অংশে। দুটি থাকবে দুই প্রান্তে সংযোগ সেতুতে। নদীর ভেতরের ৪০টি পিলারের প্রতিটিতে ৬টি করে পাইল করা হবে। এ জন্য মোট ২৪০টি পাইল করতে হবে। সংযোগ সেতুর দুটি পাইলে ১২টি করে ২৪টি পাইল করতে হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল পদ্মা সেতু। ১৯৯৮-৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর ফেব্রুয়ারি মাসে পদ্মা সেতুর নকশার জন্য পরামর্শক নিয়োগ করা হয়। তবে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে গেলে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু তৈরির উদ্যোগ নেয়।
গত ২০১৪ সালের জুন মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজের সঙ্গে এই সেতু নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২৬ নভেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ কর্তৃপক্ষ এ বছরের মার্চে চীনের প্রথামতো মাওয়ায় পদ্মার পাড়ে দুটি গরু, দুটি ছাগল ও দুটি মোরগ জবাই করে সেগুলোর রক্ত নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করে।