দেশে বেকারত্বের হার বেড়েছে— বেকারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৩০ হাজারে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ থেকে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের কারিগরি সহযোগিতায় ২০১৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জরিপ করে বিবিএস— এটিই ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রথম শ্রমশক্তি জরিপ।
বিবিএস এর আগে তিন থেকে পাঁচ বছর পর পর শ্রমশক্তি জরিপ করত। এতে মৌসুমভিত্তিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। এ জন্য ত্রৈমাসিক জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজারের বেশি নমুনা নিয়ে প্রথমবারের মতো জরিপটি পরিচালনা করা হয়।
আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
জরিপে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৩০ হাজার। তিন বছর আগে ২০১৩ সালে জরিপে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৯০ হাজার। এ সময়ে বেকারের সংখ্যা শতকরা হিসাবে ৪.৩ % ছিল। সর্বশেষ হিসাবে সেটি বেড়ে সাড়ে ৪% দাঁড়িয়েছে।
এ জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরুষ বেকারের সংখ্যা অনেক বেশি। দেশে পুরুষ বেকারের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ, অবশিষ্ট নারী। এক দশক আগে মোট বেকার ছিল ২০ লাখ মানুষ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিবিএস বেকারত্বের যে পরিসংখ্যান দেয়, তার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ৫ শতাংশের বেশি বেকার, সেখানে বাংলাদেশে সাড়ে ৪ শতাংশ বলা হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দরিদ্র দেশের মানুষ হিসেবে কোনো না কোনো কাজ করে খেতে হয়। এটিকে কর্মসংস্থানের হিসেবে অ্যাখ্যা দেয়া পুরোপুরি অনুচিত।
তিনি বলেন, মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দ্রুত শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। বর্তমান চাকরির বাজারে যোগ্যতা ও দক্ষতা খুবই কম। তাদের সনদ অনুযায়ী চাকরি মিলছে না। এ কারণে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। সরকার দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে বড় ধরনের সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলে আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। গত কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে হয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে, বাণিজ্য বড় হয়েছে এবং অর্থনীতির বহুমুখিতার কারণে বেকারের সংখ্যা বাড়ার কথা নয়।
তিনি বলেন, নমুনা সংখ্যা এবং পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকার কারণে বেকারের সংখ্যায় তারতম্য হতে পারে— তবে প্রকৃতপক্ষে বেকারের সংখ্যা বাড়ার কথা নয়।
বিবিএসের হিসাবে, এক দশকে ১১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। ফলে দেশে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ কোটি ৮৭ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ কর্মজীবী চার কোটি ১৮ লাখ এবং নারী এক কোটি ৭০ লাখ। দ্রুত বেকার থেকে মুক্তি পাওয়ার দিক দিয়ে এগিয়ে শহরের মানুষ। ২০০৫ সালে শহরে কর্মজীবী ছিল এক কোটি ১৩ লাখ। এটি ২০১৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৬৪ লাখ। এ সময়ে গ্রামে কর্মজীবী বেড়েছে মাত্র চার লাখ।
কে কেমন বেতন পায়: বিবিএসের হিসেবে, কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে। এক দশক আগে অর্ধেকের বেশি মানুষ কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।
এ ক্ষেত্রে অকৃষি খাত, বিশেষ করে উৎপাদন, সেবা ও ব্যবসাই ভরসা। বর্তমানে ৫৬ শতাংশ মানুষ কৃষিবহির্ভূত খাতে নিয়োজিত। কর্মজীবী মানুষের মাসিক আয়ের একটি হিসাবও করেছে বিবিএস। এতে দেখা গেছে, অর্ধেক কর্মজীবী মানুষ মাসিক ভিত্তিতে বেতন পেয়ে থাকে। এসব মানুষের গড় আয় ১১ হাজার ৬৮২ টাকা। তবে পেশার ভিন্নতায় পার্থক্য আছে। শহরের ব্যবস্থাপকরা ৩০ হাজার ৮১ টাকা ও টেকনিশিয়ানরা ২২ হাজার ৩১৬ টাকা পান।
শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ
শ্রমশক্তির বাইরে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। বর্তমানে সাড়ে চার কোটি মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে অবস্থান করছে। এর অধিকাংশই নারী। প্রায় তিন কোটি ৫২ লাখ নারী শ্রমশক্তির বাইরে। এর আগের জরিপ ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৬১ লাখ। যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে বলা হয়েছে, নারীদের কর্মসংস্থান ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। জাপান শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে।