বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাত, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগগুলোকে বরাবরই মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
এসবের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে স্বাধীন গণমাধ্যমকে চাপে রেখে মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত করার ঘটনাগুলো।
মঙ্গলবার প্রকাশিত অ্যামনেস্টির মানবাধিকার-বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এ বিজ্ঞাপন না দিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের সতর্ক করা, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নিবন্ধন বাতিলে সংসদীয় কমিটির সুপারিশ, ব্লগার হত্যাকাণ্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ঘটনা বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নতুন নতুন বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
লন্ডনে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে অ্যামনেস্টির এ প্রতিবেদনে ২০১৫ সালে মানবাধিকারের বৈশ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলন শেষে বাংলাদেশ-বিষয়ক ব্রিফিংয়ে অ্যামনেস্টির বাংলাদেশ-বিষয়ক রিসার্চ ফেলো আব্বাস ফায়েজ বলেন, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের ঘটনাগুলো বন্ধে সরকারের কাছ থেকে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের ওপর জেলায় জেলায় মামলা দেয়ার ঘটনাকে ভিন্নমত দমনের চেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি আরো বলেন, জরুরি অবস্থার সময়ে ডিজিএফআই ওই সব খবর সংবাদমাধ্যমের হাতে দিয়েছিল। অথচ ওই সব সংবাদ যারা তৈরি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে বার্তাবাহকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
অ্যামনেস্টির দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক পরিচালক চামপা প্যাটেল বলেন, সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের প্রতি যা হচ্ছে, তা বাংলাদেশে সামগ্রিক মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ভীতিকর। মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো অগ্রগতি না হওয়ার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব অনেকাংশে দায়ী।
বাংলাদেশে মত প্রকাশে স্বাধীনতার পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের সমালোচনা করা স্বাধীন গণমাধ্যমগুলো মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে।
গত অক্টোবর মাসে সরকার কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করে দিয়ে বলছে, তারা যেন দেশের শীর্ষ দুটি দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এ বিজ্ঞাপন না দেয় এবং বিজ্ঞাপন দিলে তারা শাস্তির মুখোমুখি হবে।
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পত্রিকা দুটি সমালোচনামূলক অবস্থানের জন্য পরিচিত।
এদিকে, অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে গণমাধ্যমের ওপর চাপ ছাড়াও মত প্রকাশে আরও কিছু অন্তরায়ের উদাহরণ তুলে ধরা হয়।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, সংসদের সমালোচনা করায় গত নভেম্বরে একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করে।
এছাড়া গত বছর ব্লগার ও প্রকাশক হত্যা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রাখার ঘটনা মত প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এতে আরো বলা হয়, ব্লগাররা তাদের ধর্মনিরপেক্ষ মত প্রকাশ করায় ইসলামি জঙ্গিদের হাতে আক্রান্ত হচ্ছেন। সরকারি কর্তৃপক্ষ লেখালেখির মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়র জন্য ব্লগার ও প্রকাশকদের অভিযুক্ত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের লোকদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দালিলিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সেটা কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি। গত বছর পর্যন্ত এমন ১৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
গত বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাত্রীবাহী বাস ও অন্যান্য যানবাহনে পেট্রলবোমা হামলায় কয়েক ডজন মানুষ হতাহতের ঘটনা ও এর জের ধরে শত শত বিরোধী নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, সরাসরি হামলায় জড়িত ছিল এমন কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।
বছরের শেষ দিকে দুই বিদেশি নাগরিক হত্যা ও সিলেটে শিশু রাজন হত্যার ঘটনাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।